সার্ক সচল করতে সার্ক প্লাস ধারণা

সংগৃহীত ছবি
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ক দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। ২০১৪ সালে সর্বশেষ নেপালে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৬ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উরিতে সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রতিবাদে ভারত যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
দুই দেশের দ্বন্দ্বের কারণে সার্কের কার্যকারিতা হারানোর প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সার্ক প্লাস ধারণা। বর্তমানে সার্কের পর্যবেক্ষক মর্যাদায় রয়েছে ৯টি দেশ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চীন ও মিয়ানমার। এ দুটি দেশকে পূর্ণ সদস্যের মর্যাদা দিয়ে সার্ক প্লাস ধারণার বাস্তবায়ন এবং এর সম্প্রসারণের ধারণা জোরালো হচ্ছে দিন দিন। বিশেষ করে চীনের অন্তর্ভুক্তি সার্কে ভারসাম্য বজায় রাখা ও কার্যকর সংগঠনে পরিণত করতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞের মত। সার্কভুক্ত সব দেশের সঙ্গে চীনের অত্যন্ত গভীর বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চীনেরও সার্কের সদস্য হওয়ার ব্যাপারে বরাবরই আগ্রহ। তাই অনেক ভূ-রাজনীতি বিশেষজ্ঞের মতে সার্কে চীনের অন্তর্ভুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সূচনা করতে পারে।
বিএনপি ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠন করার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে আঞ্চলিক কূটনীতির সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছে সার্ককে সচল করা। ২৪ ফেব্রুয়ারি সার্ক মহাসচিব মো. গোলাম সারওয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মন্ত্রী সার্কের পুনরুজ্জীবনে বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, সংস্থাটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, দারিদ্র্য বিমোচন, শক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগসহ আঞ্চলিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোয় মূল্যবান ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের এই উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সম্প্রতি ‘রি-বিল্ডিং ট্রাস্ট, রি-নিউয়িং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি বলেছেন, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার যেকোনো আন্তরিক প্রচেষ্টা একটি সৎ বা সঠিক রোগ নির্ণয়ের মাধ্যমে শুরু হওয়া উচিত। সার্ক রাজনৈতিক অবিশ্বাস, অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় বিবাদ, সীমান্ত উত্তেজনা, ক্ষমতার বৈষম্য এবং পরস্পরবিরোধী নিরাপত্তা ভাবনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিনের ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা ঐকমত্য গঠন করা কঠিন করে তুলেছে এবং প্রায়ই আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোকে করেছে মন্থর বা ধীরগতির।
তাই সার্কের পুনরুজ্জীবন বা একে নতুন করে সক্রিয় করার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার— উভয়ই প্রয়োজন বলে মনে করেন শামা ওবায়েদ।
সার্কের যে অভাবনীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে, তা উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। এই বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মোট বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার অঞ্চলটির অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য থেকে আসে। অন্যদিকে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মানুষের আবাসস্থল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশের জোট আসিয়ানের ক্ষেত্রে, যা প্রায় ২৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে, তবে তারা প্রায় ৬৭ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে পারবে, যা বর্তমান বাণিজ্যের প্রায় তিনগুণ।
প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও একই কথা বলেছেন। তার মতে দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রগতিতে আশানুরূপ ফলাফল না পাওয়ার অন্যতম স্পষ্ট সূচক হলো এর বাণিজ্য। দক্ষিণ এশীয় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল বা সাফটা আইনি ও প্রশাসনিকভাবে টিকে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ার যে গতিশীল আঞ্চলিক বাজারের প্রয়োজন ছিল, তা এটি তৈরি করতে পারেনি। সংবেদনশীল তালিকা, অ-শুল্ক বাধা বা নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার, প্যারা-ট্যারিফ, দুর্বল লজিস্টিকস ব্যবস্থা, কাস্টমসে বিলম্ব, মানদণ্ডের দুর্বল সমন্বয় এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা— এসবই এর কার্যকারিতাকে সীমিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান গত ২৯ এপ্রিল ঢাকায় সার্কের কৃষিবিষয়ক ‘ডেভেলপমেন্ট পার্টনারস অ্যান্ড ইনভেস্টর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বলেছেন, সার্ককে শক্তিশালী করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। কৃষি এ অঞ্চলের অর্থনীতির মূলভিত্তি এবং এর টেকসই উন্নয়নে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার ব্যাপারে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবন্ধ। তারই অংশ হিসেবে সার্কের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সার্ক নিয়ে বাংলাদেশের এই উদ্যোগ শুরু হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেনি বাংলাদেশ।
দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস বলেছিলেন, একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল সার্ক। তবে এটি এখন শুধু কাগজে-কলমে আছে, কাজ করছে না। ‘সার্কের চেতনার’ পুনরুজ্জীবন হওয়া উচিত। আট সদস্যের এই জোট আঞ্চলিক অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা নিয়ে ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘ভারত ও অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই। তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে ন্যায্য ও সমতার ভিত্তিতে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস মনে করেন, পৃথিবী এখন নানা সমস্যার সম্মুখীন। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া দুষ্কর। তার মতে, পৃথিবী এখন ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) থেকে বেরিয়ে এসে মেটা-ভূরাজনীতিতে (Metageopolitics) মনোযোগ দিচ্ছে। ঐতিহ্যগত ভূ-রাজনীতিতে সীমানা ও সামরিক শক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু মেটা-ভূরাজনীতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে মানুষের নিরাপত্তা, জলবায়ু মোকাবিলা, জনস্বাস্থ্য এবং ডিজিটাল কানেকটিভিটির মতো বিষয়গুলোর ওপর, যা দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের জন্য অভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
সার্ককে আরও প্রসারিত করা এবং বাইরের সংলাপ অংশীদার ও উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে যুক্ত করে সার্ক প্লাস ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেছেন, ‘সার্ককে দ্বি-রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্বের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে এর সম্প্রসারণ জরুরি।’
ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাসের মতে, সার্ককে সচল ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে কিছু আঞ্চলিক সংগঠনকে অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন— আসিয়ান, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আসিয়ান থেকে শেখা যায়, বৈচিত্র্যের মধ্যেও কীভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। সেক্টরভিত্তিক সহযোগিতা কীভাবে আস্থার সংকট দূর করতে পারে, তা শেখা যায় ইইউ থেকে।




