ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দুয়ার খুলছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিনের জটিলতা আর নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে গতি ফিরেছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে। প্রকল্পের ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ অবকাঠামোগত কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন পুরো প্রকল্প শেষ হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রস্তুত অংশগুলো ধাপে ধাপে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আবদুল্লাহপুর থেকে ধউড় এবং আশুলিয়া থেকে বাইপাইল অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এরপর ঈদুল ফিতরের আগে বাইপাইল থেকে শ্রীপুর পর্যন্ত অংশও খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হওয়ার আগেই এর সুফল পেতে শুরু করতে পারেন সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর, বাইপাইল ও ইপিজেড এলাকার মানুষ।
প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আগস্ট পর্যন্ত সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি ৫৬ দশমিক ০২ শতাংশ। প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭৩ শতাংশ। বিভিন্ন অংশের স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের অনুমোদনের কাজও এগিয়েছে; এ পর্যন্ত এ কাজের অগ্রগতি ৯২ দশমিক ৩০ শতাংশ।
২০২২ সালের ১২ নভেম্বর শুরু হয় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ। শুরুতেই ভূমি অধিগ্রহণ, ইউটিলিটি স্থানান্তর, নকশা পরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় প্রকল্পের গতি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল অনিশ্চয়তা। তবে এখন এসব সমস্যার বড় অংশই কেটে গেছে। ফলে নির্মাণকাজও এগোচ্ছে দ্রুতগতিতে।
প্রকল্পের ৫ হাজার ১৬৪টি পাইলের মধ্যে ৪ হাজার ৬১৭টির কাজ শেষ হয়েছে। ১ হাজার ৪৪৪টির ক্যাপ বা ক্রস বিমের মধ্যে শেষ হয়েছে ১ হাজার ২৪৮টির কাজ। ২ হাজার ২১৫টি পিয়ার কলামের মধ্যে ১ হাজার ৭৭৯ এবং ১ হাজার ২৬৭টি পিয়ার ক্যাপের মধ্যে ৯০৮টির কাজ শেষ হয়েছে।
উড়ালপথের মূল কাঠামোর ৯ হাজার ৪২৭টি টি-গার্ডারের মধ্যে ৬ হাজার ৬৪৯টির নির্মাণ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ৩৪৫টির ইরেকশনও সম্পন্ন হয়েছে। ২১৬টি বক্স গার্ডারের মধ্যে ২০৮ এবং ১ হাজার ২৩৩টি ডেক স্ল্যাবের মধ্যে ৯১০টির কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এখন প্রকল্পে নতুন করে বড় কোনো জটিলতা নেই। তার ভাষ্য, নতুন করে খরচ বা সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে যেসব অংশ আগে প্রস্তুত হবে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
নির্মাণকাজ এগোলেও প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৭ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার মূল প্রকল্পের সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৮৫ কোটি ৬৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ৫৩২ কোটি টাকা। নকশা পরিবর্তন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং কর-শুল্কের পরিবর্তনকে ব্যয় বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ ও সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানোর প্রক্রিয়াও বেশ এগিয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তুরাগ নদের ওপর নির্মাণকাজের নকশায়। প্রকল্পের প্রাথমিক নকশার সময় তুরাগ নদ ছিল তৃতীয় শ্রেণির। পরে নদটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত হওয়ায় নৌযান চলাচলের জন্য উড়ালপথের নিচে আরও বেশি উচ্চতা ও প্রশস্ততা রাখার প্রয়োজন হয়।
আগের নকশায় তুরাগের ওপর এক খুঁটি থেকে আরেক খুঁটির দূরত্ব ছিল ৩০ দশমিক ৪৮ মিটার এবং নদীর উপরিভাগ থেকে সেতুর তলদেশের উচ্চতা ছিল ৭ দশমিক ৬ মিটার। নতুন নকশায় সর্বোচ্চ স্প্যান ৯০ মিটার এবং সেতুর তলদেশের উচ্চতা ১২ দশমিক ২ মিটার করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে প্রকল্পের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের পাশাপাশি নির্মাণ ব্যয়ও বেড়েছে।
নতুন নকশায় সাভারের আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় নতুন সেতু ও ইন্টারসেকশন যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ এবং মেট্রোরেলের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সাভারের ইপিজেড থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাওলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে এই উড়াল মহাসড়ক। এটি বিদ্যমান ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে সাভারের ইপিজেড থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ৪৪ কিলোমিটার পথ একটানা পাড়ি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
র্যাম্পসহ পুরো প্রকল্পের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৮২ কিলোমিটার। এর মধ্যে মূল উড়ালসড়ক ২৪ কিলোমিটার, র্যাম্প ১০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার, নবীনগরে ১ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার উড়ালপথ এবং ২ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সেতু রয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ করা হবে ১৪ দশমিক ২৮ কিলোমিটার নতুন সড়ক। থাকবে ১৮ কিলোমিটার ড্রেনেজ ও ডাক্ট।
প্রাথমিকভাবে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। পরে প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল বাড়িয়ে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা এখন বলছেন, পুরো প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই প্রস্তুত অংশগুলো খুলে দেওয়া হবে।
ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই এর সুফল পেতে শুরু করতে পারেন উত্তর-পশ্চিম ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ। সাভার, আশুলিয়া, নবীনগর, বাইপাইল ও ইপিজেডের দীর্ঘদিনের যানজট কমানোর পাশাপাশি উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩০ জেলার মানুষের ঢাকায় প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্যও রয়েছে এই প্রকল্পের।



