বাড়ছে ধর্ষণ-নির্যাতন-হত্যা, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন

ফাইল ছবি
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ফুঁসে ওঠেছে সারা দেশ। এর একদিন পর চট্টগ্রামে আরেক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলন হয়েছে সেখানে। অভিযুক্তকে আটকের পরও তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন স্থানীয়রা।
একই সময়ে রাজধানীর একটি মাদরাসা থেকে আব্দুল্লাহ নামের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায়ও রয়েছে ধর্ষণের আলামত। এর আগে মাগুরায় শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দেশ।
শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো সহিংসতা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব। কিন্তু ধারাবাহিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়।
এই চারটি ঘটনাই কেবল শিশু নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডের চিত্র নয়। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলছে, গত ১৬ মাসে দেশে অন্তত ৫৮০টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে ৪৮৩ জনকে। এই সময়ে যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও অন্তত ৩১৮ শিশু।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এইচআরএসএস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী। এর মধ্যে ৪৮৩ জন শিশু নিহত এবং ১ হাজার ৪০৭ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। একই সময়ে ৫৮০ জন শিশু ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৩১৮ জন।
এ বিষয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো সহিংসতা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব। কিন্তু ধারাবাহিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ আরও ভয়াবহ করে তুলছে পরিস্থিতিকে।’
অবিলম্বে সব শিশু হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ভুক্তভোগী পরিবারকে নিরাপত্তা, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক।
অন্যদিকে, গত চারমাসে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পহেলা জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৮ শিশু। ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ১৪ শিশু এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে তিন শিশুকে। আত্মহত্যা করেছে ধর্ষণের শিকার দুই শিশু। এছাড়া, বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত খুন হয়েছে ১১৫ শিশু।
মাদকাসক্তির বিস্তার, বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতায় বাড়ছে এধরনের অপরাধ।
আসক বলছে, সাম্প্রতিক সময়ের ধর্ষণ ও হত্যার পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সবকটিতে প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজনের শিকার হয়েছে শিশুরা।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত এসব প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার যে চিত্র ওঠে এসেছে বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা নির্যাতনের পর মৃত্যু হলেই কেবল সংবাদমাধ্যমে ওঠে আসে। আর শুধু ধর্ষণ বা শুধু নির্যাতনের ঘটনাগুলো থেকে যায় আড়ালেই। অনেকক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার শিশু তার পরিবারকে ঘটনাটি জানায় না। কিছু ক্ষেত্রে জানলেও ভয়-ভীতি-সম্মান কিংবা সামাজিক চাপের কারণে প্রকাশ করে না পরিবারগুলো। আবার ভয়ভীতি দেখিয়ে বা সামান্য অর্থের বিনিময়ে অনেক ঘটনা ধামাচাপাও দেওয়া হয় স্থানীয় পর্যায়ে।
তাদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ প্রবণতা নয়; দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয় দায়ী। মাদকাসক্তির বিস্তার, বিকৃত অনলাইন কনটেন্টের সহজলভ্যতা, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অপরাধ করে পার পাওয়ার প্রবণতায় বাড়ছে এধরনের অপরাধ। ধারাবাহিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে, শিশু সুরক্ষায় যথেষ্ট কার্যকর নয় বিদ্যমান ব্যবস্থা।
সেক্সুয়াল অফেন্স করেছেন এমন অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ফওজিয়া করিম। তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের অপরাধীদের মসজিদ, বাজার-ঘাটসহ সবকিছু থেকে প্রতিরোধ করে বয়কট করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। জনসচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে গণমাধ্যমকে।’
অপরাধী যেই হোক না কেন; অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে পরবর্তীকালে তিনি যাতে আর কোনো অপরাধে না জড়ান এজন্য দরকার সংশোধন। অপরাধীদের শুরুতেই সংশোধন করা গেলে কমে আসবে এই ধরনের অপরাধ।
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও এ ধরনের অপরাধ কেন কমছে না এমন প্রশ্নে এই মানবাধিকার কর্মী বলেছেন, ‘উন্নত দেশে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। একজনকে মেরে ফেললেই তো শেষ, কিন্তু মানুষকে তো জানতে হবে। তাই অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া এবং মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা বেশি জরুরি।’
শিশুর ওপর সহিংসতার মতো অপরাধগুলোকে গোড়া থেকে আমলে নেওয়ার কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রেজউল করিম সোহাগ। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার পেছনে রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাইকোলোজিক্যাল ইস্যু। এর সঙ্গে রয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।’ তার মতে, পরিবারগুলো ভেঙে ছোট হওয়ায় একাকীত্ব ও হতাশায় ভোগেন অনেকেই। এই সময়ে অনলাইনে বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ান কেউ কেউ। এ ধরনের ঘটনায় বাড়ছে বিবাহ বিচ্ছেদ, ক্ষোভ আর প্রতিহিংসাপরায়নতা। এখান থেকে মাদকেও জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এর সঙ্গেই বাড়ছে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ।
‘যারা ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তাদের সঙ্গে চুরি, ছিনতাই ও মাদকের সংশ্লিষ্টতাও পাওয়া যায়। তারা প্রথমে ছোট অপরাধ করে থাকে। কিন্তু এর বিচার না হওয়া তারা সাহস পায় বড় অপরাধ করার। এভাবে এক সময় তারা শিশু ও দুর্বলদের টার্গেট করে তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সাহস পায়। তারা এটা বুঝতে পারে যে, যেকোনো অপরাধই করুক না কেন, কোনো শাস্তি পেতে হবে না,’ বলছিলেন তিনি।
‘কাজেই অপরাধ ছোট হোক কিংবা বড়, অপরাধী যেই হোক না কেন; অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে পরবর্তীকালে তিনি যাতে আর কোনো অপরাধে না জড়ান এজন্য দরকার সংশোধন। অপরাধীদের শুরুতেই সংশোধন করা গেলে কমে আসবে এই ধরনের অপরাধ,’ যোগ করেন তিনি।






