সমবায় আন্দোলন দুর্বল করেছে দুর্নীতি : রাষ্ট্রপতি

জাতীয় সমবায় দিবসের আয়োজনে বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: বঙ্গভবন
সমবায় আন্দোলনকে আবারও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সমবায় সমিতিগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করা, কাজের সক্ষমতা বাড়ানো এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। আজ রবিবার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সমবায় সমিতিগুলোর মধ্যে দুর্নীতির কারণে বেশিরভাগ সমিতি নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের কার্যক্রমও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন হাতেগোনা কয়েকটি সমিতি সফলভাবে কাজ করছে। অথচ দেশে সমবায় আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই আন্দোলনকে সফল করতে হলে সমিতিগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে।’
সমবায় আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯০৪ সালে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তা চলেছে। মাঝখানে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সমবায়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগের সঙ্গে সমবায়কে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জিয়াউর রহমান ষাটের দশকে বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত ড. আখতার হামিদ খানকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। তাকে পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে সমবায় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। এতে সমবায় আন্দোলন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, সমবায় খাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান ও বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে এ খাত আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অতীতের সফল সমবায় উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমবায়ের সেই অবস্থান এখন আর নেই। ধীরে ধীরে সমবায় আন্দোলন পিছিয়ে পড়েছে। আগের মতো এই আন্দোলনের প্রতি গুরুত্ব বা মনোযোগ দেখা যায় না।’
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সমবায় খাতের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের উপযোগী করে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন এবং সময়োপযোগী করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি দেশের এনজিওগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সমবায় সমিতিগুলো যাতে টিকে থাকতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশে এনজিও কার্যক্রম বেশ সফলভাবে এগিয়েছে। এর ফলে পিছিয়ে পড়েছে সমবায় আন্দোলন। এখন সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনজিওগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এমন ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সমবায় সমিতিগুলো প্রতিযোগিতার সক্ষমতা অর্জন করে টিকে থাকতে পারে।’
সমবায় প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব পণ্য উৎপাদন করে, সেগুলোর বাজারজাতকরণে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সমবায় অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে পারে। সমবায়ভিত্তিক কোম্পানি গঠন করে এসব পণ্য বাজারজাতকরণে সমিতিগুলোকে সহযোগিতা করা যেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। পণ্য বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি দূর করা জরুরি।
সমবায়ের মূল ধারণা একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য যেসব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে সফল সমবায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশংসা করেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে তারা খুব ভালো কাজ করছে। আজকের অনুষ্ঠানে কয়েকটি সফল সমবায়ের কার্যক্রম ও অগ্রগতি দেখে আমি খুব আনন্দিত হয়েছি। তারা সত্যিকার অর্থেই অনেক ভালো কাজ করছে।’
সমবায়ীদের ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সমবায় আন্দোলন শুধু ধরে রাখলেই হবে না, এই আন্দোলন আরও এগিয়ে নিতে হবে। এ জন্য সমবায় আন্দোলনকে দেশের মানুষের সামনে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে।’
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের সভাপতি মো. আবদুস সালাম। স্বাগত বক্তব্য দেন সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালক সেলিম ফকির।
সমবায় অধিদপ্তর আয়োজিত এবারের সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘করব সমবায়, গড়ব দেশ। সবার জন্য বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে সফল সমবায়ীদের হাতে পুরস্কার ও ক্রেস্ট তুলে দেন রাষ্ট্রপতি। এর আগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে তিনি বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।




