আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ভর্তি রোগীরা অনিশ্চয়তায়, লাইসেন্স বাতিল ঘিরে বিতর্ক

সংগৃহীত ছবি
‘অপরাধ করছে, সরকার বন্ধ করবে ঠিক আছে, কিন্তু আমরা এখন কী করব? হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত, আমরা এখন কোথায় যাব?’ এভাবেই বলছিলেন ঢাকার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর স্বজন মোহাম্মদ তুহিন।
হাম ও নিউমোনিয়া আক্রান্ত হয়ে গত সাত দিন ধরে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছে তার চার বছরের সন্তান। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের পর তুহিনের মতো বিপাকে পড়েছেন অনেকেই।
শুক্রবার সকালে হাসপাতালটিতে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছেন ভর্তি থাকা রোগীদের অনেকেই। চিকিৎসা পাবেন কি না এমন শঙ্কা থেকেই হাসপাতাল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কথা জানান অনেক রোগীর স্বজন। এ ছাড়া নতুন করে রোগী ভর্তি না করা বা বহির্বিভাগ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা অনেককেই ফিরে যেতে দেখা যায়। লাইসেন্স বাতিলের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হাসপাতালটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।
একদিকে গাফিলতি ও অবহেলার প্রমাণ পাওয়ায় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে ৪০০ এর বেশি ভর্তি রোগী এবং হাসপাতালটিতে কর্মরতদের চাকরির অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘিরে বেশ জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যদিও লাইসেন্স বাতিলে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য আপিল করার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে এনেছেন হাসপাতালটির পক্ষের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। তার দাবি, হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। অবশ্য এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অনিশ্চয়তায় ভর্তি রোগীর
নেই প্রতিদিনের ব্যস্ততা, ভিড়। শুধু হাসপাতালের কর্মী, আগের ভর্তি রোগীদের স্বজন আর গেটের বাইরে ক্যামেরা হাতে কয়েকজন গণমাধ্যম কর্মী। শুক্রবার দুপুরে সরেজমিন আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে এমনই পরিস্থিতিই দেখা যায়। হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার পথে রোগী বা তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন গণমাধ্যম কর্মীরা।
ঢাকার বাংলামটর এলাকার বাসিন্দা সুমন বিশ্বাস জানান, সন্তানের চিকিৎসার জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ থাকায় অন্য হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন।
হাসপাতালের গেটের কাছেই ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় কয়েকজনকে। তাদের কারো চিকিৎসা সম্পন্ন হয়েছে, আবার কেউ কেউ চিকিৎসার মাঝ পথেই হাসপাতাল বদলাচ্ছেন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে চিকিৎসা নিতে আসা মোকসেদ আলী বলেছেন, ‘সোমবারের দিন সিজার হইছে, ডাক্তাররা বলছিল কয়েক দিন থাকা লাগবে। গত রাতে আবার বলল মোটামুটি সুস্থ বাসায় নিয়ে যাতি পারেন, তাই আজকে চলে যাচ্ছি।’
লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর থেকেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নতুন করে রোগী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে। আর যেসব রোগী হাসপাতালটিতে আগে থেকেই চিকিৎসাধীন, তাদের শারীরিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে, আবার কাউকে অন্য হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে হাসপাতালটির নার্স কিংবা কর্মচারীদের অনেককেই। তারা বলছেন, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে তাদের চাকরির ব্যবস্থা কে করবে? গণমাধ্যম কর্মীদের ওপরও ক্ষোভ রয়েছে তাদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতাল প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, অপেক্ষাকৃত কম ক্রিটিক্যাল রোগীদেরকে ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছেন তারা। তবে ক্রিটিক্যাল রোগী- অর্থাৎ যারা আইসিইউতে বা পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে রয়েছেন, তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময় নেওয়া হচ্ছে। ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা অব্যাহত আছে।
শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ওই হাসপাতালে কতজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন- এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য দেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে ১১ জুন লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের পর এক বিজ্ঞপ্তিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল যে, তখনো ৪১৬ জন রোগী সেখানে ভর্তি ছিলেন। যার মধ্যে এনআইসিইউতে ৬০ নবজাতক শিশু, আইসিইউতে ২০ জন এবং সিসিইউতে ভর্তি চার জন রোগী।
লাইসেন্স বাতিল ঘিরে বিতর্ক
গত ২৭ মে ভোরে মগবাজারের আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এক হাসপাতালে প্রায় একই সময়ে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর এই ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন তৈরি করেছিল। এই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসায় অবহেলাসহ নানা অভিযোগ তোলেন ভুক্তভোগীরা।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ওই দিনই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রাথমিকভাবে জানানো হয়, যে ওয়ার্ডে এই ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে ‘শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের মতো পরিস্থিতি’ পাওয়া গেছে।
৪ জুন ওই কমিটির দেওয়া প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও দায়িত্বরত নার্স-স্টাফদের অবহেলার বিষয়টি উঠে আসে। এই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালটিকে ‘লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না’ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। যেখানে ৭ জুন বিকাল পাঁচটার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে যে জবাব ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা সন্তোষজনক নয়। লাইসেন্স বাতিলের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনা করার আইনি সুযোগ রয়েছে বলেও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মেডিকেল প্রাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ রেগুলেশন অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ অনুযায়ী হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালটির পরিচালক মো. তারিকুল ইসলাম মুকুল জানালেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপিল করবে।
এ ছাড়া, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত জনস্বার্থ বিবেচনায় হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। ‘আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের যেন কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
এদিকে, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স নয়, বরং প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আইনজীবী শিশির মনির। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শুক্রবার দুপুরে এই বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি। যেখানে তিনি দাবি করেছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নোটিসে হাসপাতালের বদলে প্যাথলজির লাইসেন্স নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। লাইসেন্স বাতিলের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। এ বিষয়ে কথা বলতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।







