সংসদে প্রধানমন্ত্রী
বাজেট মানুষের জীবনে স্বস্তি দিয়েছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সর্বোচ্চ বিবেক ও জ্ঞান কাজে লাগিয়ে, দায়িত্ববোধ থেকে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে— বললেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জানালেন, সরকার চেষ্টা করেছে এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করতে, যাতে স্বস্তি পায় দেশের সব মানুষ। সরকারি দলের সদস্য হিসেবে এই বাজেটের একটি নামও দিলেন তিনি। আর সেটি হলো, ‘জীবনবান্ধব বাজেট’।
গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথাই বললেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলছিলেন, ‘বাস্তবতা অনেক কঠিন। তারপরও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে যে বাজেটটি আমরা এখানে উপস্থাপন করেছি, অবশ্যই আমরা চেষ্টা করেছি আমাদের সর্বোচ্চ বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান দিয়ে এমন একটি বাজেট উপস্থাপন করতে, যাতে শ্রেণি-পেশা ও সমাজের সব মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির শ্বাস ফেলতে পারে।’
বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের পরও দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
দাম বাড়েনি, সেটিও উল্লেখ করলেন তারেক রহমান। বললেন, ‘আমরা অতীতে লক্ষ্য করেছি যে বাজেট
উপস্থাপনের আগে ও পরে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই বেড়ে
যেতে। তবে এ বছর আমরা সেরকম কোনো দৃশ্য দেখিনি।’
নিত্যপ্রয়োজনীয় বলতে সাধারণত যা বোঝায়, তেমন ৬১টি পণ্যের ওপর থেকে আগের নির্ধারিত ট্যাক্স
প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে, সেই তথ্যও যুক্ত করলেন তিনি।
সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন, তার সরকার সেই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। তার ভাষ্য, ‘একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে, রাজনৈতিক সরকার হিসেবে আমরা মনে করি আমাদের জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব তার একটু হলেও আমরা হয়তো পূরণ করতে পেরেছি। কিছুটা হলেও আমরা জনগণকে স্বস্তি দিতে পেরেছি।’
পাচার হওয়া সম্পদ ফেরানো হবে। ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা
আগের সরকারগুলোর দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, অর্থ পাচার এবং ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল; সে বিষয়টিও তুলে ধরলেন সংসদে। সেই সঙ্গে বললেন, অতীতে নেওয়া অনেক বড় প্রকল্প এখন জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকার সংকটকে অস্বীকার করছে না এবং কোনো অজুহাতও দিচ্ছে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা হবে।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারের তিন ধাপের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরলেন সরকারপ্রধান। যার মধ্যে প্রথম ধাপে রয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতির অবনতি ঠেকানো, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে জোর দেওয়া। পাশাপাশি বাড়ানো হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষার আওতাও। দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে কাজ করবে সরকার। আর তৃতীয় ধাপে উৎপাদনশীল, উদ্ভাবননির্ভর, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন, ‘সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে তরুণদের বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হবে না। তারা মেধা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে।’ আর এ লক্ষ্যেই দেশীয় শিল্পের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তার সরকার।
তারেক রহমান কথা বললেন তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা নিয়েও।
তিনি বলছিলেন, তিস্তা শুধু উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি
নদী নয়, এটি বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি এবং অর্থনীতির জন্যও কৌশলগত ইস্যু। জানালেন,
জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে
বর্তমান সরকার। এই ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে
শুষ্ক মৌসুমে তা সেচ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হবে।
আগামী পাঁচ বছরে দেশের ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী। যার মধ্যে গত তিন মাসে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখননের কাজ হয়েছে।
তার কথায় উঠে এলো বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে সরকারের উদ্যোগের কথাও। জানালেন, এ পর্যন্ত ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সম্পদ উদ্ধারে ৬০টির বেশি নন-ডিসক্লোজার চুক্তি সই হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যত দ্রুত সম্ভব পাচার হওয়া সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলবে।
জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বললেন, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাজেট পাসের আগে প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব দেন। তিনি ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিধান প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে ‘কালো টাকা সাদা করার’ বিতর্কিত বিধান বাতিল, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি, ব্যক্তিগত আয়করের অব্যাহতির সীমা বাড়ানো এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর কমানোর বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জনমত গঠনে বিরোধী দলের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান ছিল তার।




