মন্ত্রীর চিঠি ঘিরে তোলপাড় বিমানে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুর্নীতি, শৃঙ্খলা ও পেশাগত অনিয়মের অভিযোগে অতীতে চাকরিচ্যুত এক পাইলটকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ডিরেক্টর (প্ল্যানিং) পদে বসানোর সুপারিশ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানমের চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২৮ এপ্রিল মন্ত্রী এক চিঠিতে সাবেক পাইলট রেজাউর রহমানকে বিমানের ডিরেক্টর (প্ল্যানিং) পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেন। পরিচিত চিঠিতে বলা হয়, বিমানের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন— এ বিবেচনাতেই রেজাউর রহমানকে সুপারিশ করা হয়েছে। একই চিঠিতে পূর্বে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাবিব উল্লাহ মনজুরের নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বাতিলের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
চিঠিটি প্রকাশ্যে আসার পর অ্যাভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই এ উদ্যোগকে মেধা ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। বিমানের দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ক্যাপ্টেন রেজাউর রহমানের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গ ও পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ অনেক পুরনো।
২০০৫ সালের ১৭ এপ্রিল বিমানের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর বিমানের সাবেক পাইলট ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইউনুস লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে বলা হয়, আগের দিন পাইলটদের সংগঠন বাপা কার্যালয়ে ক্যাপ্টেন রেজাউর রহমান তাকে প্রাণনাশের হুমকি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। ইউনুসকে বাম কাঁধে ঘুসি মারেন তিনি।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে বিমানের প্রধান চিকিৎসক ডা. কায়েস কামালকে মারধর ও দুর্ব্যবহার, গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে অসদাচরণ করে কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং ২০০২ সালে ব্যাংকক বিমানবন্দরে এক যাত্রীকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বাপার কর্মকর্তা জলিলকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার হুমকি এবং ২০০৪ সালে বিমানের বিএটিসি ক্লাসরুমে ক্যাপ্টেন আব্দুল্লাহ ফারুক, এনাম ও ইরফানের উপস্থিতিতে উগ্র আচরণের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়। এসব ঘটনায় সে সময় সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
পরে ২০০৭ সালে একাধিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তৎকালীন চিফ অব ট্রেনিং ক্যাপ্টেন আবু সাইদ মুনিরের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তাকে ফ্লাইট ডিউটি ও প্রশিক্ষণ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ২ জুলাই ২০০৭ তারিখে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক বৈঠকে তিনি বিমানের পাইলট থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জিএমজি এয়ারলাইনসের’ প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন, যা স্বার্থের সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৮ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন। যথাসময়ে নোটিস না দেওয়ায় পরবর্তীকালে তার দুই মাসের বেতন থেকে নোটিস-পে কেটে নেওয়া হয়। চাকরি ছাড়ার পর তিনি একাধিক বেসরকারি এয়ারলাইনসে কাজ করেন।
এর আগে ২০১৫ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি বিমানে পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেন। তবে তার অতীত রেকর্ড বিবেচনা করে ২০১৬ সালের ৩ জানুয়ারি বিমানের তৎকালীন জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) হাসান আহমদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে সহকর্মী ও যাত্রী লাঞ্ছনা, পেশাগত অনিয়ম এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার রেকর্ড থাকা একজন ব্যক্তিকে বিমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর (প্ল্যানিং) পদে নিয়োগের সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘এটি নীতিগত সুপারিশ। নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার আগে সব দিক যাচাই-বাছাই করা হবে।’
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক মুখপাত্র বললেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা আছে। এটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়াধীন। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
অ্যাভিয়েশন খাতের একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইনসে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও পেশাগত রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিতর্কিত অতীত থাকা কাউকে এমন পদে আনার চেষ্টা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিমানের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে পুরো বিষয়টি নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা।






