ব্যবস্থা না নিয়ে অভিযুক্তদের বহাল রেখে পদায়নের চেষ্টা বিমানে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত। তবুও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই। বরং বহাল রাখা হয়েছে দায়িত্বে, দেওয়া হয়েছে নতুন পদায়নও। অথচ সেই কর্মস্থলে যোগই দেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। বিমানের একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।
যানবাহন (এমটি) বিভাগ সংক্রান্ত নিরাপত্তা বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে এয়ারলাইনসটির দীর্ঘদিনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার, নিয়োগে অসংগতি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে।
অভিযোগের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম স্টেশনের তৎকালীন ইনচার্জ (এমটি) এবং কনিষ্ঠ কর্মকর্তা (শিডিউলিং) মো. গোলাম আমানুল্লাহ হক। চট্টগ্রাম স্টেশনে তার প্রায় ৪০ মাসের পোস্টিংয়ের মধ্যে শেষ ১৮ মাস— জানুয়ারি ২০২২ থেকে জুন ২০২৩ সময়ের জ্বালানি ব্যবহারের গুরুতর অসংগতি বিভাগীয় তদন্তে খতিয়ে দেখা হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তার বাকি ২২ মাসের জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব উদ্দেশ্যমূলকভাবে তদন্তের বাইরে রাখা হয়েছে।
তদন্তে আরও অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে মূল ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এবং আর্থিক জরিমানা বা কঠোর শাস্তি এড়াতে তদন্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পরিচালকদের প্রভাবিত করতে ব্যয় করা হয়েছে মোটা অঙ্কের অর্থ।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে ৪৮ হাজার ৮৫৮ লিটার জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। পরবর্তী ১৮ মাসে তা কমে দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ৬০৯ লিটারে। অর্থাৎ, দুই সময়ের মধ্যে ১০ হাজার ২৪৯ লিটার পার্থক্য পাওয়া যায়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকার বেশি। কিলোমিটারপ্রতি লিটার হিসাবেও অস্বাভাবিক পার্থক্য ধরা পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে গাড়ির ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি জ্বালানি গ্রহণের রেকর্ড পাওয়া গেছে, যা অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
এ বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রাথমিক ও বিভাগীয় তদন্তে গুরুতর অসংগতি, তেলের হিসাব লোপাট ও জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় এক বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত এবং আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া গত ৩ মে তাকে বিমান মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগ না দিয়ে এখনো তেলের পাম্পে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মো. গোলাম আমানুল্লাহ হকের বক্তব্য জানতে আগামীর সময় যোগাযোগের চেষ্টা করলে প্রথমে তিনি পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কোনো মন্তব্য না করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে পুনরায় যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তদন্তে জ্বালানি চুরির একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ২০২২ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকা মেট্রো-৫১-৫১২৫ নম্বর গাড়ির চালক মো. হারুনুর রশিদ তালুকদার (জি-৫২৪৭৪) ৭০ লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংকে একবারে ৭১ লিটার তেল নেওয়ার হিসাব দেখান। তদন্ত কমিটির মতে, গাড়ি সচল থাকলে ট্যাংকে সবসময় ২-৩ লিটার তেল অবশিষ্ট থাকে, ফলে ৬৭-৬৮ লিটারের বেশি নেওয়া সম্ভব নয়। এই ভুয়া হিসাব অনুমোদন করায় তৎকালীন ইনচার্জ গোলাম আমানুল্লাহ হক এবং সাবেক জেলা ব্যবস্থাপক মীর আকতারুজ্জামান দায় এড়াতে পারেন না। এ অনিয়মের প্রতিবাদ করায় বশির হোসেন নামের এক অপারেটরকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর তথ্যও উঠে এসেছে।
এত গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও গোলাম আমানুল্লাহ হকের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তৎকালীন এমডি ও সিইও ড. শফিকুর রহমানের সময়ে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে পদ না থাকা সত্ত্বেও তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং পুনরায় যানবাহন শাখায় পদায়নের প্রক্রিয়া চালানো হয়—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে পৃথক তদন্তে উঠে এসেছে এমটি অপারেটর মো. সুমন মিয়া (আইডি: জি-৫৩১৮১, ক্যাজুয়াল আইডি: সি-৩৯৮০)-এর নাম। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি নিয়োগ শাখায় দুটি ভিন্ন এসএসসি সনদ জমা দেন।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ২০০২ সালের ঢাকা বোর্ডের একটি সনদ সম্পূর্ণ ভুয়া বলে স্বীকার করেন। অন্যদিকে, তার দাবি করা ২০০৭ সালের কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ভোকেশনাল সনদটিও সংশ্লিষ্ট বোর্ড ‘জাল’ বলে নিশ্চিত করেছে।
এ জাল সনদ চক্রের পেছনে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শামসুজ্জামান খানের সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দক্ষিণ পীরেরবাগে বাসা ভাড়া নিয়ে জাল সনদ তৈরির একটি চক্র পরিচালনা করতেন। প্রতিটি সনদ ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হতো এবং অনলাইনে ভুয়া এন্ট্রি তৈরি করে সনদগুলোকে আসল হিসেবে দেখানো হতো। এসব তথ্য ডিবি পুলিশের কাছেও স্বীকার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তদন্তে আরও উল্লেখ করা হয়, এমটি বিভাগে চাকরিচ্যুত ও বিতর্কিত কয়েকজন কর্মচারীর মধ্যে মো. মিজান (আইডি: জি-৫০৩০১) রয়েছেন, যিনি তেল চুরির দায়ে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর এক ক্রুর ৫ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনায় আটক হন। একইভাবে উঠে এসেছে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে চাকরিচ্যুত মো. শাহীন (জিএল: জি-৫০৩৩৮)-এর নামও।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এ দুজনই এমটি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কামাল উদ্দিনের নিকটাত্মীয় (ভাগ্নে)। সেই সঙ্গে বিতর্কিত কর্মীদের পুনর্বহালের আবেদনও সাম্প্রতিককালে আলোচনায় এসেছে।
হজ ফ্লাইট অপারেশন ও ডিউটি বণ্টন নিয়েও সিন্ডিকেট প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ডিউটিতে বিতর্কিত বা শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মীদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ২৫ এপ্রিল নতুন বিমান বোর্ড গঠনের পরপরই অভ্যন্তরীণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকের মাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা ডিউটি বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পাশাপাশি, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বিমান শ্রমিক লীগের (সিবিএ) কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে উত্তরায় লাঠিসোঁটা ও অস্ত্র নিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ৫ আগস্টের পর বলাকা ভবনে ভাঙচুর, বিশৃঙ্খলা এবং কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
অভিযোগ রয়েছে, কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন একটি চক্র জাল সনদের মাধ্যমে বহু লোককে বিমানে নিয়োগ দিয়েছে। একই সঙ্গে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. শফিকুর রহমান এবং পরিচালক (প্রশাসন) মোমিনুল ইসলাম অন্যায়ভাবে কামাল উদ্দিনকে পদোন্নতি দিয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



