প্রকৃতির সুইচে চলে গ্যাস-বিদ্যুৎ!
- সাগর উত্তাল হলেই গ্যাসের চাপ তলানিতে
- গরম বাড়লে সঙ্গে বাড়ে লোডশেডিংও
- ঝড়-বৃষ্টিতে অন্ধকারে ডোবে গ্রামাঞ্চল

সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস মিলছে না। কোথাও কোথাও দিনের বেশিরভাগ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। ছবিটি রাজধানীর মাজার রোডের। শামীম-উস-সালেহীন
সাগর একটু উত্তাল হলেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ কমে আরও বাড়ে গ্যাসসংকট। গরম যত চড়ে, তত বাড়ে লোডশেডিংও। আবার ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুতের চাহিদা কমলেও দুর্বল বিতরণব্যবস্থার কারণে গ্রামাঞ্চলে ‘মেঘ দেখলেই’ কোথাও কোথাও বন্ধ হয়ে যায় বিদ্যুৎ সরবরাহ। সবমিলিয়ে প্রকৃতি একটু বেগতিক হলেই থমকে যায় কোটি মানুষের জীবন। এমনই চিত্র এখন দেশের জ্বালানি খাতের। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন হয়ে পড়েছে আবহাওয়ানির্ভর। যার প্রভাব পড়ছে জ্বালানি নিরাপত্তায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দেড় দশকে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে শতভাগ মানুষ। কিন্তু এ খাতে টেকসই উন্নয়ন না হওয়ায় সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি খাতে সর্বনাশের পেছনে দায়ী অতিমাত্রায় আমদানিপ্রবণতা। এই পরিস্থিতির উত্তরণে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সাগর উত্তাল হলেই গ্যাসের চাপ তলানিতে: গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা দৈনিক অন্তত ৫৫০ কোটি ঘনফুট। সংযোগ বিবেচনায় চাহিদা ৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট। সরবরাহ হয় গড়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা উচ্চমূল্যের এলএনজি থেকে আসে কমবেশি ১০০ কোটি ঘনফুট।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মোট সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। সেখানকার গ্যাস খালাসের প্রক্রিয়াটা আবহাওয়ানির্ভর। চলতি মাসের গোড়ার দিকে সাগর উত্তাল হওয়ায় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে জাহাজ ভিড়তে না পারায় দৈনিক ৩০-৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। গত বছরের জুনে বৈরী আবহাওয়ায় জাহাজ নোঙর করতে না পারায় এলএনজি সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সঞ্চালন লাইনে আসার কথা, তা নেমে এসেছিল মাত্র ২০ কোটিতে।
এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় নিরাপত্তার কারণে এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাহাজ গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নিলে প্রতিদিন কয়েকশ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে যায়। এমন উদাহরণ আছে আরও।
এই নির্ভরতা কমাতে সরকার সম্প্রতি বঙ্গোপসাগরে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২৬টি সমুদ্র ব্লক নিয়ে নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। পাশাপাশি স্থলভাবে অনুসন্ধান ও পুরনো গ্যাস কূপ সংস্কারে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। যদিও ফল পেতে সময় লাগবে কয়েক বছর।
গরমে বাড়ে লোডশেডিং, ঝড়-বৃষ্টিতে লাইন বিপর্যয়: বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। শীতকালে চাহিদা কমে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামে। কিন্তু গরমে চাহিদা হয় ১৮ হাজার মেগাওয়াট।
জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে লোডশেডিং। গড়ে আড়াই হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট, কখনো কখনো লোডশেডিং হয় আরও বেশি। বেশি দুর্ভোগে পড়েন গ্রামের মানুষ। এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় ঝড়-বৃষ্টির সময়, যখন তাপমাত্রা কমে বিদ্যুতের চাহিদাও কমে যায়। তখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা থাকলেও দুর্বল বিতরণব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎবিহীন থাকেন লাখো মানুষ।
ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে তারের ওপর পড়া, খুঁটি উপড়ে যাওয়া বা ট্রান্সফরমার বিকল যাওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। অনেক সময় দুর্ঘটনা এড়াতে বিতরণ সংস্থাগুলো ঝড় শুরু হওয়ামাত্র নিজ উদ্যোগে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। আবার বেশি দাম দিয়ে নিম্নমানের খুঁটি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কেনার অভিযোগ রয়েছে আরইবির বিরুদ্ধে। ফলে সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতে বিতরণব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। গত কোরবানির ঈদের সময় ঝড়-বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় বিতরণব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। টানা পাঁচ দিন বিদ্যুৎ ছিল না অনেক এলাকায়। বৈরী আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: দেশের বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা আধুনিক ও নিরাপদ নয় বলে জানালেন পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ। আগামীর সময়কে তিনি বলছিলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় হওয়ায় বৈরী আবহাওয়ায় সরবরাহ বিঘ্ন হয়।
বিভিন্ন দেশে অঞ্চলভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে জানিয়ে এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বললেন, ‘আমরা যদি ধীরে ধীরে সেদিকে যেতে পারি এবং বিতরণ লাইন মাটির নিচে নিতে পারলে ঝড়-বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট কমবে। এগুলো ব্যয়বহুল হলেও নিরাপদ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম। পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় পোলের ওপর যে উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক তার রয়েছে তার নিচে জাল দেওয়া যেতে পারে, যাতে কোনো কারণে তার ছিঁড়ে গেলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হয়।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলছিলেন, জ্বালানি খাতে আমদানি-নির্ভরতা বাড়লে ঝুঁকিও বাড়ে। সেজন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে তবে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে আরেকটি এলএনজি টার্মিনাল করা যেতে পারে। স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে সময় বেশি লাগলেও বৈরী আবহাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন হয় না। তা ছাড়া, এর নির্মাণব্যয়ও তুলনামূলক কম। এসবের পাশাপাশি অন্তত এক সপ্তাহের এলএনজি মজুদ রাখা এবং সবাইকে সাশ্রয়ী হওয়া দরকার।




