ঢাকার নদীপথে ফিরছে ওয়াটার বাস, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীপথে আবারও যাত্রীবাহী ওয়াটার বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে নদীদূষণ, নাব্য সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং যাত্রী আকর্ষণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
তিনি বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
আজ রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকার চারপাশের নদীপথে যাত্রীবান্ধব নৌপরিবহন চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত এক ফলোআপ বৈঠক শেষে তিনি এ তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন জানিয়েছেন, নৌপথ সচল করার পাশাপাশি কীভাবে ঢাকার নদীগুলোর দূষণ প্রতিরোধ করা যায়, ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নয়ন করা যায় এবং নদীর নাব্য ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী নদীর চারপাশে নির্মিত ওয়াকওয়ের পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর নির্দেশনা দেন, যাতে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হয় এবং নদীর তীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়।
সেতুমন্ত্রী বলেছেন, রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোকে শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, পর্যটনবান্ধব জলপথ হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে গাবতলী থেকে আশুলিয়া, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ, সদরঘাট ও বসিলা ঘুরে আবার গাবতলীতে ফিরে আসার একটি রুট বিবেচনায় রয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীদূষণ। সরকারি জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১টি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৬টি এবং ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি পয়েন্ট থেকে সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্প-কারখানার প্রায় ১৫০টি পয়েন্ট থেকেও দূষিত বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ৪২৪টি স্থান দিয়ে নদীতে বর্জ্য পড়ছে। এসব উৎস বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে পরিকল্পনা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শেখ রবিউল আলম বলেছেন, নদীর বিভিন্ন স্থানে দুর্গন্ধ ও আবর্জনার কারণে অনেক মানুষ নৌপথে ভ্রমণে আগ্রহ হারান। দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ উন্নত করা গেলে যাতায়াতের পাশাপাশি বিনোদনের জন্যও ওয়াটার বাস জনপ্রিয় হতে পারে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে কিছু এলাকায় নাব্য সংকট দেখা দিলেও বর্ষায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো থাকে। অতীতে যমুনা থেকে পানি এনে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও বালু নদীর প্রবাহ সচল রাখার একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। আপাতত বিদ্যমান পরিস্থিতির মধ্যেই সেবা চালুর প্রস্তুতি চলছে।
মন্ত্রী বলেছেন, এর আগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এ সেবা পরিচালনা করলেও গত ১০ বছরে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা লোকসান হওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। এবার কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ সেবা পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের সম্পৃক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
লোকসানের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, আগের সেবায় পর্যাপ্ত ওয়াটার বাস ছিল না। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। একই গন্তব্যে সড়কপথে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগলেও নদীপথে সময় লাগত দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। এতে যাত্রীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতেন। তবে নির্ধারিত বিরতিতে পর্যাপ্তসংখ্যক ওয়াটার বাস চালানো গেলে যাত্রী বাড়তে পারে। যদিও এতে পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে।
শেখ রবিউল আলম আরও বলেছেন, হাতিরঝিলে ওয়াটার বাস সফল হলেও সেখানে দূরত্ব কম এবং যাত্রী বেশি। ঢাকার চারপাশের দীর্ঘ নদীপথে একই মডেল পুরোপুরি কার্যকর হবে না। তাই যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পর্যটনকেও গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি জানিয়েছেন, কয়েকটি সেতুও এ প্রকল্পের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে টঙ্গির রেলসেতুর নিচ দিয়ে ওয়াটার বাস চলাচলের পর্যাপ্ত উচ্চতা নেই। রেলসেতু উঁচু করা সম্ভব না হওয়ায় ওই স্থানে যাত্রীদের এক পাশে নেমে সেতু পার হয়ে অপর পাশে অপেক্ষমাণ ওয়াটার বাসে ওঠার বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে।
মন্ত্রী জানিয়েছেন, এখনো এ প্রকল্পের জন্য আলাদা কোনো বাজেট নির্ধারণ করা হয়নি। আপাতত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজ নিজ দায়িত্বের আওতায় প্রয়োজনীয় কাজ করবে। ভবিষ্যতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হবে।
শেখ রবিউল আলম বলেছেন, বিভিন্ন দপ্তরকে এরই মধ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে আবার বৈঠক হবে। এরপর বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীবান্ধব ওয়াটার বাস সেবা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।





