বিশ্ব প্রবীণ দিবস : শেষ জীবনে আইনি ঢাল নয়, যত্ন চান তারা

এক প্রবীণের ফাইল ছবি
মানিক্কোর বয়স এখন ৯৫। বয়সটা তার অনুমাননির্ভর। আসল বয়সের কোনো দলিল-দস্তাবেজ নেই। তবে মায়ের কাছে বর্ণনা শুনে তার বয়সের আনুমানিক হিসাবটা বের করা হয়েছে অনেক বছর আগে। বয়সের ভারে আজ মানিক্কো শুধু নুইয়েই পড়েননি, বরং হাঁটার সময় তাকে ইংরেজি উল্টো ইউ অক্ষরের মতো দেখায়। দুই হাঁটুতে মাঝেমধ্যে মাথাটাও যেন লেগে যায়। তবে মানিক্কোর হুঁশজ্ঞান এখন তাকে সঙ্গ দেয়। পুরনো দিনের প্রায় সব স্মৃতিই তার মনে আছে। আজকাল এগুলোই তার সময় কাটানোর খোরাক। মানিক্কোর মতো দেশের কোটি প্রবীণেরও হয়তো একই দশা।
ছেলে আইনজীবী, পুত্রবধূ অধ্যাপক, মেয়েও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী। নাতি-নাতনিদের অনেকেই এখন দুই-তিন সন্তানের জনক-জননী— এই দীর্ঘ যাত্রার সবকিছুর সাক্ষী মানিক্কো। মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে তিনি টের পান পুত্রবধূর ভালোমন্দ রান্নার সুবাস, ছেলের ল্যাপটপে খটখট শব্দ আর নাতি-নাতনিদের বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে আড্ডার শব্দ। তবে মানিক্কোর ঘরটিতে তীব্র এক নীরবতা। প্রায়ই অপেক্ষা করেন কখন সবার সময় হবে তাকে ঘিরে গল্প করার, তার কথা শোনার। মানিক্কোর কপাল ভালো, তাই তাকে হয়তো এই অপেক্ষা বেশি করতে হয় না। তবে তার মতো আরও অনেক প্রবীণকেই দু-চারটে বাক্যালাপের জন্য অপেক্ষা করতে হয় অনেক দিন বা মাসের।
এই যেমন ৭৩ বছর বয়সী সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ফখরুল আমিন। আজকাল দিনভর বালিশে হেলান দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকেন। মাঝেমধ্যে ভাবেন তার অপরাধ? তিনি এখন আর উপার্জনের সারিতে নেই। শরীরের পেশি শিথিল। তবে চোখ দুটি ঝাপসা জলে। পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে যিনি একসময় ছিলেন অধিনায়ক, আজ তিনিই নিজ ঘরেই সবচেয়ে ‘অনাবশ্যক’। অথচ দশ-পনেরো বছর আগেও এই মানুষটির ডাকে পুরো বাড়ি গমগম করত। অফিস, পরিবার, নানা ঘরোয়া আয়োজনের হিসাবনিকাশ— সবকিছুই চলত তার আঙুলের ইশারায়। আজ সেই ঘরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া তো দূরের কথা, কোনো আলোচনায় তার উপস্থিতিকেও কেউ আবশ্যক মনে করে না। দেশের বেশিরভাগ প্রবীণের অবস্থাই আজকাল ফখরুল আমিনের মতো।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ১ অক্টোবর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বাংলাদেশ সরকারের ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩’ অনুসারে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই হিসাবে বর্তমানে দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৬৫ লাখ। এই সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ। তবে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান এবং জাতিসংঘের মানদণ্ড (৬৫+ বছর) অনুযায়ী এই সংখ্যায় কিছুটা তারতম্য রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এসব প্রবীণ মানুষের সুরক্ষায় আইনের অভাব নেই। যেমন ‘পিতৃ-মাতৃ ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী সন্তানের ওপর মা-বাবার অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সংস্থান করা বাধ্যতামূলক। কোনো সন্তান তা লঙ্ঘন করলে অনধিক তিন লাখ টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের জন্য প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ যাতায়াত সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষার অঙ্গীকার স্পষ্ট। এমনকি দেশের সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে। কিন্তু দিনশেষে এসব আইন ঘরের বিষাদ দূর করতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনের ভয়ে কোনো সন্তান হয়তো বৃদ্ধ মা-বাবার অ্যাকাউন্টে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সেই টাকা তার একাকিত্বের ক্ষত সারায় না।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাজারকেন্দ্রিক আধুনিক সমাজ এখন মানুষের মূল্য নির্ধারণ করে তার ‘উৎপাদনশীলতা’ দিয়ে। ফলে যিনি আয় করছেন না, তিনি যেন হঠাৎ করেই পরিবারের কাছে আজ ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে পড়ছেন। অথচ যুক্তির দিকে তাকালে বোঝা যায়, আজ যে তরুণ আধুনিক জগতের শীর্ষে বসে আছেন, তার ভিত তৈরি হয়েছিল ওই প্রবীণেরই ত্যাগের ওপর। তাই সমাজবিজ্ঞানীদের পরামর্শ, শুধু আইন করে প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবারকেও বুঝতে হবে মানবিকতার মূল সুর।



