পদত্যাগে শেষ সাহাবুদ্দিনের আলোচিত অধ্যায়
- বিকাল ৪টার দিকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন সাহাবুদ্দিন। এরপর তার একান্ত সচিব এবং সামরিক সচিব পত্রটি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে নিয়ে যান।
- স্পিকার হাফিজ উদ্দিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ৪-৫ মিনিট

মো. সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের নামটি এসেছিল অনেকটা অাকস্মিকভাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রপতি অাবদুল হামিদের বিদায়ের পর ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চমক দেখিয়ে মো. সাহাবুদ্দিনকে দেশের এক নম্বর ব্যক্তি হিসেবে বেছে নেয়। কিন্তু এর ১৬ মাসের মাথায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও এর পরের দিনগুলো তাকে দেয় বিরল অভিজ্ঞতা। রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা েপরিয়ে ; লালিত মতাদর্শের বাইরে গিয়ে তিনি পার করেছেন ড. ইউনূস সরকারের ১৮ মাস, অতঃপর আরও মাস পাঁচেক বিএনপি সরকারের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত তাকে বেছে নিতে হলো পদত্যাগের পথই। গতকাল শুক্রবার অপরাহ্ণে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির পদকে বিদায় জানালেন মো. সাহাবুদ্দিন। তার পদত্যাগে সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিদায়ী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ফোনালাপ করেন। প্রায় ৪-৫ মিনিটের ফোনালাপে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন ও তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে হাফিজ উদ্দিন বললেন, ‘মাফিয়া আমলে নির্বাচিত হলেও জনগণের সরকারের প্রতি মো. সাহাবুদ্দিনের সমর্থন ছিল।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জন শুরু হয় গত বুধবার থেকে। এরপর কখন মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন, সেদিকেই ছিল সবার নজর। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সফর সংক্ষিপ্ত করে গতকাল দুপুরে দেশে ফেরার পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। বঙ্গভবনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অাগামীর সময়কে জানিয়েছেন, বিকাল ৪টার দিকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর তার একান্ত সচিব এবং সামরিক সচিব পত্রটি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে নিয়ে যান। ওই কর্মকর্তা জানালেন, ‘পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষরের সময় সাহাবুদ্দিনের পাশে তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একদমই স্বাভাবিক।’
বিদায়ী রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব েমাহাম্মদ সাগর হোসেন অাগামীর সময়কে বললেন, রাষ্ট্রপতির পদ থেকে কোেনা চাপের মুখে পদত্যাগ করেননি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি আসলে জটিল রোগে আক্রান্ত। কয়েক মাস ধরে তিনি শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। পদত্যাগ করার পর একটি গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রপতি নিজে বলেন, ‘কোনো চাপের মুখে আমি পদত্যাগ করিনি। যারা এসব বলছেন, তারা অপপ্রচার করছেন।’
বঙ্গভবন সূত্রে জানা গেছে, অাজ বঙ্গভবন থেকে আগামীকাল রবিবার গুলশান-১-এর ‘গ্রিন ভিলা’য় উঠবেন মো. সাহাবুদ্দিন। পদত্যাগের পর সন্ধ্যায় নিকটাত্মীয়রা বঙ্গভবনে এসে তাকে সহমর্মিতা জানিয়েছেন।
‘অামার সুদৃঢ় ভূমিকার কারণে দেশে সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারের কাছে যে পদত্যাগ জমা দেন, তাতে কারণ হিসেবে ‘শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের’ কথা বলেছেন। আর নিজের মেয়াদকাল মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখেছেন, তার ‘সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে’ দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
স্পিকারের কাছে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি বললেন, ‘আমি মো. সাহাবুদ্দিন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করি এবং অদ্যাবধি নিষ্ঠা, সততা ও সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালে ৫ অাগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি হয়। সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে।’
সাহাবুদ্দিন এরপর লিখেছেন, ‘নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়ে সরকার পরিচালনা করছে। বর্তমানে সরকারি দল ও বিরোধী দল গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যে দিয়ে জাতীয় সংসদে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। আমার সুদৃঢ় ও ইতিবাচক ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।’
পদত্যাগের কারণ তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানীং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি নামে রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই।’
‘রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন। এমন অবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে যা বললেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ
বিকাল ৫টার দিকে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার কিছু সময় পর জাতীয় সংসদ ভবনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়া হাফিজ উদ্দিন আহমদ এ সময় বললেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি (মো. সাহাবুদ্দিন) মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সবসময়। আমি তার মঙ্গল কামনা করি।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের গুঞ্জনের মধ্যে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে গতকাল শুক্রবার দুপুরে দেশে ফেরার পর বিকাল সাড়ে ৫টায় সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বললেন, স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকালে তার কাছে পদত্যাগপত্রটি এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী এখন তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়েছেন জানিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বললেন, সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তার স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র বিকাল ৫টা ১ মিনিটে স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। রাষ্ট্রপতি লিখিতভাবে তার পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেছেন, গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার পক্ষে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।
পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি অসুস্থতার যে কারণগুলো দেখিয়েছেন, তা তুলে ধরে স্পিকার বললেন, রাষ্ট্রপতি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতায় ভুগছেন। এর আগে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তার শরীরে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে তিনি মাঝেমধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে তা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের নথিতে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্পিকার। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ায় সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানিয়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বললেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’ পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত হাফিজ উদ্দিন এই দায়িত্বে থাকবেন।
এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই তিনি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও নিয়েছিলেন। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন বলেও সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা গুজব সম্পর্কে এক প্রশ্নে স্পিকার বললেন, ‘আজ আমি দুপুরে দেশে ফিরে নানা ধরনের কথাবার্তা শুনেছি। দেখা গেল, তিনি প্রকৃত শারীরিক অসামর্থ্যের কারণে পদত্যাগ করেছেন। আমি তার মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি।’
আরেক প্রশ্নের উত্তরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বললেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সঙ্গে দেশের ভালোমন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগের নামও প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝেমধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এজন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নেই। যিনি যেখানে নিজেই এটি দাবি করেছেন।’
রাষ্ট্রপতির এই পদত্যাগ নিয়ে কোনো ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বললেন, ‘আমরা আশা করি, এই পদত্যাগের ফলে সব ধোঁয়াশা পরিষ্কার হলো। রাষ্ট্রপতি দেশের একজন সম্মানিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি, তিনি পদত্যাগ করতেই পারেন এবং এই চেয়ার কখনো শূন্য থাকে না এবং আমি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। এটি হলো বাস্তবতা। আশা করি, সব ধরনের কনফিউশন এখন থেকে দূর হয়ে যাবে।’
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসন অবসানের পর রাষ্ট্রপতি অপসারণের দাবি উঠলেও তিনি টিকে ছিলেন। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর তিনি পদত্যাগ করলেন; যদিও তার মেয়াদের প্রায় পৌনে দুই বছর বাকি ছিল।




