ভরসার কয়লা বিদ্যুতেও অস্বস্তি

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল কয়লা। কিন্তু কয়লা সংকট ও কারিগরি ত্রুটিতে ছয়টি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। আর বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে কমবেশি আড়াই হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণসক্ষমতায় চালানো গেলে বিদ্যুতের সংকট অনেকটাই কাটানো যেত।
দেশীয় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও কয়লা সংকট ও কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন হচ্ছে ৪৮০০ মেগাওয়াটের মতো।
চাহিদা মেটাতে ভারতের আদানি থেকেও প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। কয়লাস্বল্পতায় এক মাস ধরে তারা সীমিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। কয়লা সরবরাহ বাড়ার পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর উৎপাদন বাড়ছিল। কিন্তু হঠাৎ ওইদিন রাত ১১টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে সরবরাহ কমে দেশে লোডশেডিং বেড়ে যায়।
মেরামত শেষে গতকাল রবিবার থেকে আবার পুরোদমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানি। সন্ধ্যা ৬টায় দুটি ইউনিট থেকে তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে ১৪৫৩ মেগাওয়াট।
এদিকে আদানির বিদ্যুতে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও গতকালই কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। মাঝে কয়লাস্বল্পতায় উৎপাদন কমেছিল। এখন তা আরও কমে ৬০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ১২৩৪ মেগাওয়াট।
রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক আনোয়ারুল আজিম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, মেরামত কাজ শেষ করতে অন্তত চার দিন সময় লাগবে।
এদিকে পায়রা ১১৬৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্তমানে মাত্র ৫৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে; সেখানেও কারিগরি ত্রুটি। কেন্দ্রটি পূর্ণসক্ষমতায় চালু হতে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সেখানকার কর্মকর্তারা।
একই কারণে বরিশালের ৩০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১০০ মেগাওয়াটের মতো কম উৎপাদন হচ্ছে। বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিটে দীর্ঘদিন ধরেই কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। এতে বিদ্যুতের উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০০ মেগাওয়াট। অন্যদিকে মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমেছে।
এদিকে কয়লা সংকটের পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পটুয়াখালী ১১৭০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে ৭০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে।
একের পর এক কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কেন এমন যান্ত্রিক ত্রুটি হচ্ছে, তা জানতে চাইলে পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এসব কেন্দ্র বছরে একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। ওই সময় পার হলে নানা কারিগরি ত্রুটি হতে পারে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেই রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কিন্তু বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গিয়ে সময়মতো এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুতের যখন এই দশা, তখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকট বাড়িয়েছে গ্যাস। অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় রান্নার চুলা জ্বলছে না। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘ লাইন। গ্যাস-বিদ্যুতের অভাবে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ রয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট সামাল দিতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে উৎপাদন ও শিপমেন্টে বিলম্বের কারণে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকিও সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে টানা দেড় মাসের বেশি চলা সংকটের পর আজ সোম রাত বা আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ আরও ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট বাড়াতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে এলএনজি থেকে গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এটিকে বাড়িয়ে অন্তত ৯৫ কোটি ঘনফুটে নেওয়া হবে। এতে মোট গ্যাস সরবরাহ ২৫০ কোটি ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে।
সরকারি হিসাবেই দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বাস্তবে চাহিদা প্রায় ৫৫০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ বাড়লে সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।
তারা বলছেন, আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ
পর্যন্ত নিয়মিত এলএনজি আমদানির শিডিউল রয়েছে। অক্টোবরে ১০টি কার্গো লাগবে, যার মধ্যে
ছয়টি এরই মধ্যে কেনা হয়েছে।



