ভারতের ঋণ বাদ দিয়ে যুক্ত এআইআইবি
- অনুমোদন পাচ্ছে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প
- আগামী একনেকে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত
- ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব কমবে ১১৪ কিলোমিটার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অবশেষে অবসান ঘটতে যাচ্ছে বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত একটি নতুন রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প আট বছর আটকে ছিল ঋণ জটিলতায়। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে অনুমোদন পেতেই। এখন অনুমোদনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে। সমাধান হয়েছে অর্থায়নেরও। ভারতীয় ঋণ বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংককে (এআইআইবি)। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
প্রশ্ন থাকলেও এটির জন্য পরামর্শ নিতেই বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। মোট ব্যয় বাড়ছে ৪ হাজার ৯৯০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ হবে। ফলে ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব কমবে ১১৪ কিলোমিটার।
পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকের সম্ভাব্য তারিখ। এরই মধ্যে ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্পটির প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হওয়ায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রথম দিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ২ হাজার ৪৩৩ কোটি ১০ লাখ এবং ইন্ডিয়া লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণ থেকে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ। এরপর বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকারি অংশে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫ হাজার ৯০২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।
এখন প্রথম সংশোধনীতে ভারতীয় ঋণ বাদ দিয়ে এআইআইবির ঋণে প্রকল্প ব্যয় ১০ হাজার ৫৭০ কোটি ২৯ লাখ টাকা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের ৩ হাজার ৮১ কোটি এবং এআইআইবির ঋণের ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা খরচ করা হবে। এক্ষেত্রে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় বাড়ছে ৪ হাজার ৯৯০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল। পরে দফায় দফায় তিন বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এবার প্রথম সংশোধনীতে সাড়ে পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। শুরু থেকে গত মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৭১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ ছাড়া ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ।
প্রকল্পের আওতায় মূল কার্যক্রম হচ্ছে— নতুন ডুয়েলগেজ মেইন লাইন ৮৫ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার এবং লুপ লাইন নির্মাণ ৩৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া করতোয়া নদীর ওপর ২৪৬ মিটার এবং ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার সেতু নির্মাণ, ছোট-বড় মিলে আরও ১২১টি সেতু নির্মাণ, ঢাকা-রংপুর হাইওয়ের ওপর একটি রেল ওভারপাস তৈরি, সিরাজগঞ্জ জংশনসহ আটটি নতুন স্টেশন নির্মাণ। স্টেশনগুলো হবে কৃষ্ণদিয়া-রায়গঞ্জ-চান্দাইকোনা-সনকা-শেরপুর-আরিয়া বাজার ও রানীরহাটে। এ ছাড়া বগুড়া-নাটোর হাইওয়ের ওপর একটি রোড ওভারপাস নির্মাণ, তিনটি স্টেশন পুনর্নির্মাণ, বগুড়া স্টেশনটিকে আধুনিক স্থাপনা হিসেবে তৈরি করা হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) অর্থায়নের উৎস হিসেবে ভারতীয় এলওসি-৩ রাখা হয়েছিল। ওই অর্থায়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিশদ নকশা ও খসড়া দরপত্র নথি তৈরি করে। এ ছাড়া বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অনুকূলে ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধ করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত এলওসি পর্যালোচনা সভার ২৩তম বৈঠকে ভারত সরকার প্রকল্পটিকে এলওসি-৩ কাঠামো থেকে বাদ দেয়।
ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এর আগে আগামীর সময়কে বলেছিলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশ উভয়পক্ষই যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাতিল করেছে ভারতের ঋণটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেরি হওয়ায় ভারত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমরাও দেখলাম বিকল্প অর্থায়নের পথ যেহেতু আছেই তাই ভারতকে ধরে রাখার দরকার নেই।’
এদিকে গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত চতুর্থ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সভার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন করা হয়েছে প্রকল্পের শিরোনাম। মূল ডিপিপিতে নাম ছিল ‘বগুড়া থেকে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন, সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ।’ বর্তমানে নতুন শিরোনাম হলো— ‘বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মূল অনুমোদনের সময় পরামর্শক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এখন ১৬৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৩১ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
একনেকের জন্য তৈরি কার্যপত্রে পরিকল্পনা কমিশনের মতামত তুলে ধরেছেন ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়া। তার ভাষ্য হলো— এটি বাস্তবায়িত হলে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত ৮৫ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ হবে। এর মাধ্যমে রাজধানীর ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর রেলপথের দূরত্ব কমবে ১১৪ কিলোমিটার। সেই সঙ্গে সময় বাঁচবে ও ব্যয় কমবে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলে আধুনিক রেল পরিষেবা প্রসারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।



