দেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেড় কোটি মানুষ, উত্তরণে বেশকিছু সুপারিশ

সংগৃহীত ছবি
দেশে দেড় কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ১ কোটি ৮১ লাখ। এর মধ্যে ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ থাকবেন জরুরি অবস্থায়।
আজ সোমবার খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিডএফপি), অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার, সেভ দ্য চিলড্রেন এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশনের (জিএআইএন) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় জানানো হয় এসব তথ্য। রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অনুষ্ঠিত এ কর্মশালায় বাংলাদেশের সর্বশেষ ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) বা সমন্বিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যায় শ্রেণিবিন্যাস বিশ্লেষণ প্রকাশ ও আলোচনা করা হয়।
এদিকে, আইপিসি প্রতিবেদন নিয়ে আজ সোমবার ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের দেড় কোটি মানুষ’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ‘আগামীর সময়’।
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিবীক্ষণ ইউনিটের নেতৃত্বে এবং এফএও, ডব্লিউএফপি ও আইপিসি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপের সদস্যদের কারিগরি সহায়তায় প্রস্তুত হয়েছে আইপিসি প্রতিবেদনটি। এতে ৩৬টি জেলা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ চারটি বিশেষ এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছরের মে থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার (আইপিসি পর্যায় ৩ বা তার বেশি) সম্মুখীন হচ্ছেন, যার মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি অবস্থার (আইপিসি পর্যায় ৪) মধ্যে রয়েছেন। এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাসে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখ হতে পারে। এর মধ্যে ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি অবস্থার মধ্যে থাকবেন।
এতে উল্লেখ করা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল, উপকূলীয় নির্দিষ্ট কিছু জেলা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকা জলবায়ুজনিত আঘাত, দারিদ্র্য, জীবিকার সীমিত সুযোগ, খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপের সমন্বিত সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।
প্রতিবেদনে খাদ্য পরিস্থিতির অবনতির পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রতিকূল জলবায়ু পরিস্থিতি, বন্যা, মুদ্রাস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্য, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন এবং পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতাকে প্রভাবিতকারী বৃহত্তর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে, এই চাপগুলো লাখ লাখ মানুষের পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার সুযোগকে আরও কমিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিবীক্ষণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) আয়োজনে কর্মশালায় খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ও খাদ্য সচিব ছাড়াও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন ও মানবিক সহযোগী সংস্থা, দাতা সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। তারা প্রতিবেদনের ফলাফল পর্যালোচনা করেন। বাংলাদেশে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপগুলো চিহ্নিত করেন।
সুপারিশ
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারি। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা এবং সহনশীলতা জোরদার করার লক্ষ্যে নীতি ও বিনিয়োগ নির্দেশনায় প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের ব্যবহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইপিসির এই ফল আমাদের আরও কার্যকরভাবে সম্পদ ব্যবহার করতে এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা অসহায় জনগোষ্ঠীকে সহায়তার জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করবে।’
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি বললেন, ‘এই ফলগুলো কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সহনশীলতা জোরদার করার জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, টেকসই জীবিকা এবং স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ শুধু তাৎক্ষণিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দূর করতেই নয়, বরং ভবিষ্যতে অসহায় জনগোষ্ঠীকে সংকট থেকে রক্ষা করার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিডএফপি) বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা বলছিলেন, ‘আইপিসি বিশ্লেষণটি অত্যন্ত মূল্যবান। কারণ এটি সংকট তীব্র হওয়ার আগেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। এই বিশ্লেষণে উল্লিখিত অনেক এলাকা বর্তমানে ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার সম্মুখীন, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, যেখানে ডব্লিউএফপি আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের অভিঘাত সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমকে সহায়তা করছে।’
অংশগ্রহণকারীরা বিশ্লেষণের মূল সুপারিশগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে জীবন রক্ষাকারী খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি করা, শক-রেসপন্সিভ বা সংকট-মোকাবিলা সক্ষম সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি শক্তিশালী করা, জীবিকার পুনরুদ্ধারকে সমর্থন করা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা।





