মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আঁচ বাঙালির নুন-ভাতেও!
- ডিজেল : মজুদ মাত্র ১১ দিনের
- অকটেন : মিটবে ৭ দিনের চাহিদা
- পেট্রোল : চাহিদা মেটানো যাবে ৬ দিনের

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
পৃথিবীর এক প্রান্তে চলা যুদ্ধের দামামায় কীভাবে অন্য প্রান্তের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের চুলাও কেঁপে ওঠে, তার এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হতে চলেছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা শুধু ভূ-রাজনীতি নয়, বরং বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রায়ও বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জ্বালানি সংকটে পরিবহন খরচ বাড়বে হু-হু করে। বাড়তে পারে খাবারের দাম, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের থালায়। নুন আনতে পান্তা ফুরানো পরিবারগুলোর জন্য আগামী দিনগুলো হতে পারে আরও কঠিন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়ে চাল-ডালের দাম বেড়ে টান পড়তে পারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের পকেটে। আর তেমনটা হলে বহু মানুষের থালায় কমবে ভাত, বাড়বে দীর্ঘশ্বাস। সব মিলিয়ে সীমানা ছাড়িয়ে যুদ্ধের আঁচ এখন সাধারণের হেঁশেলেও পড়তে চলেছে। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকায় এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে এমন আশঙ্কার চিত্র তুলে ধরলেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, আমলা, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরা।
মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশে এর প্রভাব’ শীর্ষক এই আলোচনার।
এতে অংশ নিয়ে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ দিলেন উদ্বেগজনক সতর্কসংকেত। জানালেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে দেশের জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার শঙ্কা রয়েছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণ মানুষের ব্যয়ভার।
তিনি স্পষ্ট করেন, এই সংকটের ফলে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ এবং পরিবহন খরচ বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে খাবারের দাম। এতে সীমিত আয়ের মানুষের জীবনধারণই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়বে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ এরই মধ্যে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর ফলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, সিমেন্ট ও ইস্পাত শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। টান পড়েছে বিদ্যুতের উৎপাদনেও। আর উৎপাদন কমলে এবং খরচ বাড়লে বাজারে এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে পণ্যের দামের ওপর, যা সাধারণ ক্রেতার পকেট কাটবে।বর্তমানে দেশের জ্বালানি মজুদ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঢাকা চেম্বারের তথ্য বলছে, দেশে এখন ডিজেলের মজুদ আছে মাত্র ১১ দিনের। অকটেন যে পরিমাণ আছে তা দিয়ে মেটানো সম্ভব সাত দিনের চাহিদা। পেট্রোলের মজুদ আরও কম, চাহিদা মেটানো যাবে মাত্র ছয় দিনের।অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রতি ইউনিট ৩০-৩৫ ডলারে পৌঁছে যাওয়ায় জ্বালানি আমদানিতে মাসে অতিরিক্ত ৮০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এই বিপুল ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়বে। ভারী হবে ঋণের বোঝা, যার পরোক্ষ চাপ পড়বে জনগণের ওপরই।ব্যবসায়ী নেতাদের ভাষ্য, রপ্তানি খাতে কনটেইনার ভাড়া ২০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। যেখানে একটি কনটেইনারে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ বাড়ছে, সেখানে পণ্যের দাম না বাড়িয়ে ব্যবসায়ীদের জন্য টিকে থাকাই কঠিন।বৈশ্বিক এই অস্থিরতা শুধু পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এক কালো মেঘ হয়ে দেখা দিয়েছে। যদি দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা বা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে খাবারের টেবিলের টানাপড়েন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়বে।একরাশ উদ্বেগের কথা তুলে ধরলেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ। ‘বাজেট ঘাটতি বেড়ে যেতে পারে, ফলে সরকারকে দেশি বা বিদেশি উৎস থেকে বেশি ঋণ নিতে হবে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেল, বিদ্যুতের দাম, পরিবহন খরচ ও খাবারের দাম বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।’‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে দেশের শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এতে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, ইস্পাত ও ওষুধ শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া জ্বালানি সংকটের ফলে বিদ্যুৎ খাতেরও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৪৮ মেগাওয়াট হলেও গ্যাসসংকট, জ্বালানি ঘাটতি ও আমদানি ব্যয়ের কারণে সরবরাহে চাপ বাড়ছে’,— যোগ করেন তিনি।বক্তব্যের একপর্যায়ে ঢাকা চেম্বার সভাপতি দিলেন আরও উদ্বেগের ইঙ্গিত। জাতিসংঘের তথ্যের বরাতে জানালেন, এই যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর বড় প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশেও। দেশে জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে এলএনজির ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ কাতারের ওপর নির্ভরশীল।তার তথ্য, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে সর্বোচ্চ ১১ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুদ রয়েছে ধারণক্ষমতার ২০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা দিয়ে সর্বোচ্চ ১১ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। একইভাবে অকটেন মজুদ রয়েছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দিয়ে সর্বোচ্চ সাত দিনের চাহিদা পূরণ করা যাবে বলে মনে করছে ডিসিসিআই।অন্যদিকে, পেট্রোলের মজুদ দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব মাত্র ছয় দিনের, যা ধারণক্ষমতার ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ। এ ছাড়া শিল্প-কারখানাগুলোতে প্রতিদিন ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ১০০ ঘনফুট।এই আলোচনায় আরও অংশ নেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিদিয়া অমৃত খান, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জাহিদুল আলম, বাপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এম মোসাদ্দেক হোসেন, বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন ও কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. সেরাজুল মাওলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজমুল হক, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ মো. শাহরিয়ার আব্দুল্লাহ, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার নাজমুল হক, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ নুরুল আবসার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. এম. শামসুল আলম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম খান ও শিল্প মন্ত্রণালয় সচিব মো. ওবায়দুর রহমান। তাদের প্রায় সবাই বৈশ্বিক অস্থিরতার এমন প্রেক্ষাপটে দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো, নীতিগত সহায়তা জোরদার এবং সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আলোচকরা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতায় জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ ও তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা ও দাম বাড়ায় দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।তারা মনে করেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশ্বব্যাপী সংঘাত বা অবরোধের প্রত্যক্ষ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে। জীবাশ্ম জ্বালানির দাম যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন নবায়নযোগ্য প্রকল্পের খরচ দ্রুত কমছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ যুদ্ধের ঝুঁকি থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে পারে। বর্তমান সংকটে বিশ্বব্যাপীই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে, যা পরিবেশবান্ধব শিল্পকে ত্বরান্বিত করছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট এড়াতে দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরই একমাত্র টেকসই পথ।














