ছয় মাসে হত্যা ৮৬ শিশু

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তিন থেকে চার বছর বয়স শিশুটির। স্কুলে যাওয়ার কথা নতুন নতুন অক্ষর শেখার জন্য, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার জন্য। কিন্তু রাজধানীর নয়াপল্টনের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই শিশুটিকে টেনে-হিঁচড়ে একটি কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর এক নারী শিক্ষক তাকে বারবার চড় মারেন, ধমক দেন। পাশে দাঁড়িয়ে আরেক শিক্ষক হাতে স্ট্যাপলার নিয়ে তার মুখের দিকে তাক করে ভয় দেখান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি শুধু একটি শিশুর কান্নাই নয়, সামনে নিয়ে এসেছে দেশের অসংখ্য শিশুর নিরাপত্তাহীনতার নির্মম বাস্তবতাকেও। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি নুরানি মাদ্রাসায় এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ, পটুয়াখালীতে এক ইমামের বিরুদ্ধে ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এবং সিলেটে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও একই প্রশ্ন সামনে এনেছে— শিশুরা তাহলে কোথায় নিরাপদ?
শিশুদের নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন সংস্থা ‘শিশুরাই সব’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে অন্তত ৮৬ শিশু। ৩১২টি ঘটনায় যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩৩৬ শিশু। অথচ ২০২৫ সালের পুরো বছরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ৩০৮ শিশু। অর্থাৎ মাত্র ছয় মাসেই আগের বছরের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী অপরিচিত কেউ নয়; বরং পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা পরিচিত মানুষ। আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে শিশুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে বিবেচিত ঘর, স্কুল ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই অনেক ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে ভয় ও সহিংসতার জায়গায়।
‘শিশুরাই সব’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ৮৬ শিশুর মধ্যে মেয়ে ৪৭ ও ছেলে ৩৬। বেশি হত্যার শিকার হয়েছে শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সীরা। প্রায় ৫০ দশমিক ৫৯ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে। ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জনপরিসরে— যেমন রাস্তা, মাঠ, বাজার কিংবা জলাশয়ে। অর্থাৎ শিশুর জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত পরিবার এবং বাইরে— দুই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে হত্যার ঝুঁকি। অপরাধীদের পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৭টি ঘটনায় মা-বাবা এবং ১১টিতে নিকট আত্মীয় জড়িত ছিল। এ ছাড়া ২২টি ঘটনায় অভিযুক্ত ছিল প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তি।
চলতি বছরে জার্নাল অব ফ্যামিলি ভায়োলেন্সে প্রকাশিত ‘প্যারেন্ট-রিপোর্টেড চাইল্ড ফিজিক্যাল অ্যাবিউজ ইন বাংলাদেশ: আ ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’-তে দেখা গেছে, প্রায় ৯৪ দশমিক ১ শতাংশ শিশু জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এবং ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু গত এক বছরে অন্তত একধরনের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে থাপ্পড় মারা, কান মোচড়ানো, চুল টানা কিংবা ঝাঁকুনি দেওয়ার মতো আচরণকে এখনো অনেক পরিবার ‘শাসন’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যেসব অভিভাবক শারীরিক শাস্তিকে কার্যকর মনে করেন, তাদের সন্তানদের নির্যাতনের ঝুঁকি ১৪ দশমিক ৩৪ গুণ বেশি।
ক্রাইসিস ডকুমেন্টেশন সেন্টারের (ক্রিডো) তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার ১৩৭ নারীর মধ্যে ৯১ জনই শিশু, যা মোট ঘটনার প্রায় ৬৩ শতাংশ। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ২ হাজার ৩৩৯টি শিশুধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আরএআইএনএনের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতি ১০০টি যৌন নির্যাতনের ৯৩টিতেই অভিযুক্ত থাকে ভুক্তভোগীর পরিচিত ব্যক্তি। বাংলাদেশের ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ইন বাংলাদেশ’ গবেষণাও তুলে ধরেছে একই চিত্র। এতে দেখা যায়, মাত্র ২৫ শতাংশ ঘটনায় অপরাধী ছিল অপরিচিত ব্যক্তি; বাকি ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত মানুষ।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশিদা চৌধুরী নীলু বললেন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, শিশু সুরক্ষায় সচেতনতার অভাব, সামাজিক নীরবতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি শিশু নির্যাতন বাড়িয়ে দিচ্ছে। দেশে আইন তুলনামূলকভাবে কঠোর হলেও তদন্তে বিলম্ব, আলামত সংগ্রহে দুর্বলতা, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর সামাজিক চাপের কারণে অনেক অপরাধী শাস্তির বাইরে থেকে যায়।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও পিএইচডি গবেষক রুমা খোন্দকার আগামীর সময়কে বললেন, নির্যাতনের শিকার শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা, ভয়, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার বিপ্লবের মতে, যৌন নির্যাতন শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং এর প্রভাব শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক সম্পর্কেও দীর্ঘদিন থেকে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেছেন, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ। ভুক্তভোগীদের জন্য দ্রুত বিচার, কার্যকর সুরক্ষা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশু সুরক্ষা নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে তবেই শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।




