উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
থাকার ব্যবস্থা না করেই ৫০০০ আনসার মোতায়েন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী ও রোগীদের সংঘাত যেন নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। কখনো চিকিৎসকের ওপর, কখনো নার্স, আবার কখনো কর্মচারীদের সঙ্গে উত্তেজনা— এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঁচশ উপজেলা কমপ্লেক্সে প্রায় পাঁচ হাজার আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। কিন্তু হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আসা এসব সদস্যের মাথা গোঁজার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। কেউ থাকছেন গ্যারেজে, পরিত্যক্ত কক্ষে আবার কেউ অস্থায়ী আশ্রয়ে ।
পদায়নপত্র নিয়ে আনসার সদস্যরা বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাচ্ছেন। অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই চিকিৎসক, নার্স ও র্কমচারী— নিজেদের থাকারই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। সেখানে অতিরিক্ত ১০ জন আনসার সদস্যের আবাসন ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য র্কমর্কতার সঙ্গে কথা হয়েছে আগামীর সময়ের প্রতিবেদকের। তারা জানান, নিরাপত্তা জোরদারে আনসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। কিন্তু সদস্যদের কোথায় রাখা হবে? কীভাবে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা হবে, এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে পুরো দায়িত্ব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর এসে পড়েছে। আচমকা এতগুলো মানুষের আবাসন ব্যবস্থা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তৃপক্ষ। কোথাও গাড়ির গ্যারেজে, কোথাও পরিত্যক্ত কক্ষে, কোথাও চিলেকোঠায় বা অস্থায়ী কক্ষে তাদের রাখা হচ্ছে। আনসার সদস্যদের আবাসনের পাশাপাশি খাবার ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তার বিষয়টি আগে থেকে পরিকল্পনায় না থাকায় শুরুতেই প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদক কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সাখাওয়াত হোসেন ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী— উভয়ের সঙ্গেই। তাদের মধ্যে সচিব বিষয়টি কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য র্কমর্কতাদের দাবি ছিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লক্সেগুলোতে আনসার মোতায়েনের। তারা নিরাপত্তা ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করবেন। তাদের কেন ব্যারাক করে দিতে হবে? মেডিকেলগুলোতে কি ব্যারাক আছে? হাসপাতালে কি জায়গার অভাব আছ? এটি তো তাদেরই চাওয়া ছিল, আনসারদের থাকার বিষয়টি তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে।’
গত বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশের ৫০০ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ হাজার সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি হাসপাতালে একজন প্লাটুন কমান্ডার, একজন সহকারী প্লাটুন কমান্ডার এবং আটজন আনসার সদস্য ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, রোগীদের নির্বিঘ্নে সেবা নিশ্চিত করা, দালালচক্র, অবৈধ অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্য, ওষুধ চক্রসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে আনসার সদস্যরা কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কে এম. আব্দুল্লাহ আল-মামুন বলেছেন, ১০ জন আনসার এসেছে। আমাদের কোয়ার্টারে একজন নার্স ছিলেন। তাকে অন্যত্র পাঠিয়ে সেখানে ৭ জনকে রেখেছি। গ্যারেজের ওপর ড্রাইভারের কক্ষ ছিলো, সেখানে ৩ জনকে রাখা হয়েছে। আপাতত কোনো রকমে থাকার জন্য ব্যবস্থা করেছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিভাগের একজন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই হঠাৎ ১০ জন আনসার সদস্য এসে দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু তাদের থাকার কোনো ব্যবস্থা নাই, যা আমাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। থাকার ব্যবস্থা করতে না পেরে তাদের ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে আগে ব্যারাক বা আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে তাদের পদায়ন করলে ভালো হতো।
পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. গিয়াস উদ্দীন খান বলেছেন, আনসার সদস্যরা হাসপাতালের কোয়ার্টারে আছে। যতদিন ব্যারাকের ব্যবস্থা না হচ্ছে তারা কোয়ার্টারেই থাকবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসনে (এমপি) আগামীর সময়কে বলেছেন, পাঁচ হাজার সশস্ত্র আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এরই মধ্যে তাদের কর্মস্থলে পৌঁছেছেন। তাদের আবাসন ব্যবস্থার কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, হবে দ্রুতই হবে। কবে হবে এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেছেন, ঠিক জানি না, কবে হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যার অভিযোগ। রোগীর স্বজনদের হামলা, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের হেনস্তা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের কারণে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
গত মে মাসে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে এক চিকিৎসকের ওপর হামলা এবং এপ্রিলে পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে চিকিৎসক মারধরের ঘটনার পর এ দাবি আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
আনসার সদস্য মোতায়েনের পর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। রোগীর স্বজন ছাড়া অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ ও ঘোরাফেরা কমেছে, দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং হাসপাতাল চত্বরে যানবাহন রাখাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।
মধুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আল্-আমিন সারোয়ার আগামীর সময়কে বলেছেন, আনসার সদস্য মোতায়েনের পর হাসপাতালের শৃঙ্খলা ফিরেছে। বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় লোকজনের প্রবেশ ও ঘোরাফেরা কমেছে। দালালদের দৌরাত্ম্যও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আনসাররা যদি সৎ ভাবে দায়িত্বপালন করে তাহলে হাসপাতালের পরিবেশ আরও উন্নত হবে। তবে আবাসনের সমস্যা রয়েছে, যা দ্রুত সমাধানের আশা প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, সশস্ত্র আনসার মোতায়েন আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।




