হামে প্রাণ হারানো ২৫ শতাংশ শিশুর বয়স ছয় মাসের কম
- ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৩ মাসে হামে মৃত্যু ৪৯ শিশুর
- ম্যাটারনাল ইমিউনিটির কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ
- হাম ও উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা ৬৮০

ফাইল ছবি
শরীরে ছোট্ট একটি র্যাশ দিয়েই শুরু হয়েছিল আল-রায়হান রাফীর অসুস্থতা। যশোর সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকার পথে ছুটে বেড়িয়েছে তার পরিবার। চারটি হাসপাতাল, দীর্ঘ উৎকণ্ঠা আর ১৫ হাজার টাকার অ্যাম্বুলেন্স যাত্রার পরও বাঁচানো যায়নি শিশুটিকে। ঢাকা শিশু হাসপাতালের আইসিইউতে তিন দিন জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের পর মাত্র ৩ মাস ১৬ দিন বয়সেই নিভে যায় রাফীর ছোট্ট জীবনের আলো।
শুধু রাফী একা নয়, হামের ভয়াবহতায় প্রাণ হারাচ্ছে ছয় মাসের কম বয়সী আরও অনেক শিশু। রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের (ঢাকা শিশু হাসপাতাল) তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৪৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর বয়স ছিল ছয় মাসেরও কম।
মৃত শিশুদের বয়স বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় সব শিশুর বয়সই এক বছরের নিচে। এর মধ্যে ৫৯ শতাংশ শিশুর বয়স ছিল ৯ মাসের কম। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মারা যাওয়া শিশুদের ২৫ শতাংশের বয়স ছিল ছয় মাসেরও কম। এমনকি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুর বয়স তিন মাসও পূর্ণ হয়নি।
দেশের সবচেয়ে বড় শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরাও উদ্বিগ্ন। হাসপাতালটির ক্রিটিক্যাল কেয়ার পেডিয়াট্রিকস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হক জানান, হামে আক্রান্ত হয়ে এক মাস বয়সী শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও তাদের হাসপাতালে ঘটেছে।
তিনি বলেছেন, ‘এসব শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই কম ছিল, অনেকেই অপুষ্টিতে ভুগছিল। কিন্তু ম্যাটারনাল ইমিউনিটির কারণে এত কম বয়সে হামে মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক নয়।’
ম্যাটারনাল ইমিউনিটি হলো শিশুর জন্মগত একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। গর্ভাবস্থায় মায়ের রক্তের মাধ্যমে এবং জন্মের পর মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর শরীরে কিছু অ্যান্টিবডি প্রবেশ করে। এসব অ্যান্টিবডি সাধারণত জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করে।
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, একটি শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হলে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবের পর বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদেরও টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবুও উদ্বেগের বিষয় হলো, টিকা গ্রহণের বয়সের আগেই ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেছেন, ‘ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের হামে মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ তার মতে, এই শিশুদের সুরক্ষায় ছয় মাসের বেশি বয়সী মানুষের অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনতে হবে। যাতে কমিউনিটিতে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়। পাশাপাশি গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রসবপূর্ব পরিচর্যা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কেন মারা যাচ্ছে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা
তিন মাস বয়সী আয়াতকে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ থেকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা শিশু হাসপাতালে আনা হয়েছিল। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর সে তীব্র নিউমোনিয়ায় ভুগতে শুরু করে। ১৫ দিনের চিকিৎসা ও লড়াইয়ের পরও তাকে বাঁচানো যায়নি। জীবনের শেষ কয়েকটি দিন কেটেছে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের হামে মৃত্যু স্বাভাবিক ঘটনা নয়। কারণ, সাধারণত গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে জীবনের প্রথম কয়েক মাস সুরক্ষা দেয়। ফলে এত অল্প বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনা বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৮৫ সালের পর থেকে দেশে হামের টিকাদান কর্মসূচির আওতা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে বাকি ৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে যারা কখনও হামে আক্রান্ত হয়নি এবং টিকাও নেয়নি। তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠেনি। এমন নারীরা যখন মা হচ্ছেন, তখন তাদের সন্তানরা হামে আক্রান্ত হওয়ার তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকছে।
তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। মা ও শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, পুষ্টিগত অবস্থা এবং শিশুর জন্মের পর যথাযথ মাতৃদুগ্ধ পেয়েছে কি না, সেসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ ইকবাল বলেছেন, ‘তিন মাস বয়সী শিশুর হামে মৃত্যুর নজির খুবই বিরল। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে মায়েদের পুষ্টি পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং শিশুরা কত দিন মাতৃদুগ্ধ পেয়েছে, সেগুলোও গবেষণার আওতায় আনা উচিত।’
এদিকে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা হামের টিকার আওতায় না থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যেও। তারা জানতে চাইছেন, টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত সন্তানদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যাবে।
দেড় মাস বয়সী রুদ্র সাহার মা অনামিকা সাহা বলেছেন, ‘হামে ছোট ছোট শিশুরা মারা যাচ্ছে। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। আমার ছেলের হামের টিকা নিতে এখনও সাড়ে চার মাস বাকি। ওকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী জানালেন, কমিউনিটিতে পর্যাপ্ত হার্ড ইমিউনিটি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সন্তান নিতে ইচ্ছুক নারীরা চাইলে নিজেদের শরীরে হামের অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পরীক্ষা করতে পারেন। এতে ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি নবজাতকের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মাতৃদুগ্ধপানের ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
হামে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮০ জনে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর গত ১৫ মার্চ থেকে নতুন করে তথ্য সংগ্রহ শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিতভাবে ৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫৮৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ১ হাজার ১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ২৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এছাড়া রাজশাহী বিভাগে ৮৭ জন, সিলেটে ৭৪ জন, ময়মনসিংহে ৫৩ জন, চট্টগ্রামে ৪৯ জন, বরিশালে ৩৯ জন, খুলনায় ২৭ জন এবং রংপুর বিভাগে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।







