দ্রুততম ১০০ গোলের রেকর্ড গড়ল বিশ্বকাপ

সংগৃহীত ছবি
গোলের পর গোল, যেন এক গোল উৎসবে পরিণত হয়েছে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ! মাত্র ৩৩তম ম্যাচেই চলতি আসরে পূর্ণ হয়ে গেল গোলের ‘সেঞ্চুরি’। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপের পর গত ৬৮ বছরে আর কোনো বিশ্বকাপ এত দ্রুত ১০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেনি।
শনিবার রাতে সুইডেনের বিপক্ষে নেদারল্যান্ডসের ৫-১ ব্যবধানের দাপুটে জয়ের ম্যাচে ডাচ ফরোয়ার্ড কোডি গাকপো যখন দলের তৃতীয় গোলটি করলেন, তখনই পূর্ণ হয় এই শততম গোল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর চেয়ে দ্রুত ১০০ গোল হয়েছিল কেবল ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে, মাত্র ২০ ম্যাচে।
চলতি বিশ্বকাপে ম্যাচ প্রতি গোলের গড় এখন ৩.০৯, যা বজায় থাকলে টুর্নামেন্ট শেষে মোট গোল সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু রক্ষণাত্মক ফুটবলের এই যুগে কেন এত গোল হচ্ছে? নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাটই কি এর পেছনে দায়ী, নাকি এর নেপথ্যে আছে অন্য কোনো রহস্য? বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে প্রধান পাঁচটি কারণ।
এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল অ্যাডিডাসের ‘ট্রিওন্ডা’ গোলরক্ষকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সাবেক ইংলিশ গোলরক্ষক জো হার্ট ও পল রবিনসনের মতে, বলটির গতি ও আচমকা দিক পরিবর্তনের কারণে দূরপাল্লার শট ঠেকাতে গিয়ে খেই হারাচ্ছেন কিপাররা। এরই মধ্যে বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে ১০টিরও বেশি গোল হয়েছে। ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে ৩০ গজ দূর থেকে যে গোলটি করেছেন, তাতেই বলের এই ‘সুইং’ স্পষ্ট ধরা পড়েছে। ২০১০ বিশ্বকাপের বিতর্কিত ‘জাবুলানি’ বলের ভূত যেন ভর করেছে এই ট্রিওন্ডাতে।
এবারের আসরটি ৪৮ দলের হওয়ায় প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেয়েছে কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো পুঁচকে দলগুলো। স্বভাবতই পরাশক্তিদের সঙ্গে তাদের শক্তির ব্যবধান স্পষ্ট। জার্মানির কাছে কুরাসাওয়ের ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া কিংবা কাতারের বিপক্ষে কানাডার ৬-০ গোলের জয়ই প্রমাণ করে, বড় দলগুলো দুর্বল প্রতিপক্ষ পেয়ে গোলের উৎসব সাজিয়েছে। তবে টটেনহামের সাবেক কোচ থমাস ফ্রাঙ্ক মনে করেন, ‘দল বাড়ায় মানের কিছুটা তারতম্য হলেও, হাতেগোনা দু-এক ম্যাচ ছাড়া বাকি দলগুলো কিন্তু একদম উড়ে যায়নি।’
১০৫টি গোলের (জার্মানি-আইভরি কোস্ট ম্যাচসহ) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় ২৮.৬ শতাংশ গোল এসেছে ম্যাচের ৭৬ মিনিট থেকে শেষ বাঁশি বাজার মধ্যবর্তী সময়ে। কাতার বিশ্বকাপের তীব্র শীতের পর এবার উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মের তীব্র গরমে খেলোয়াড়রা ম্যাচের শেষভাগে এসে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে ডিফেন্ডারদের মারাত্মক সব ভুলের সুযোগ নিয়ে স্ট্রাইকাররা গোল করে যাচ্ছেন।
তীব্র গরমের কারণে প্রতি ম্যাচে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের যে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানির বিরতি দেওয়া হচ্ছে, তা দর্শকরা পছন্দ না করলেও কোচদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। এই বিরতিতে মাঠের ধারেই খেলোয়াড়দের চটজলদি ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তন বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোচের। যেমন মরক্কোর বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ব্রাজিল প্রথমার্ধের ড্রিংকস ব্রেকের পর ১০ মিনিটের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়ে গোল শোধ করেছিল। সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন বলেছেন, ‘এই তিন মিনিটে আমরা খেলোয়াড়দের ভিডিও ক্লিপ দেখাতে পারি, পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে পারি।’
বিগত বিশ্বকাপ বা ইউরোতে দেখা গেছে, ক্লাব ফুটবলের দীর্ঘ মৌসুম শেষ করে ক্লান্ত তারকারা বিশ্বকাপে চেনা ছন্দ পান না। কিন্তু এবার চিত্রটা ভিন্ন। লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন, এমবাপ্পে করেছেন জোড়া গোল, আর নরওয়ের আর্লিং হালান্ড ও ইংল্যান্ডের হ্যারি কেনরা প্রথম ম্যাচ থেকেই আছেন বিধ্বংসী ফর্মে। সাবেক ম্যান সিটি ডিফেন্ডার মাইকা রিচার্ডস বলেছেন, ‘এবারের বিশ্বকাপে ফরোয়ার্ডদের আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। কেতাবি কৌশলের চেয়ে গোল করার আনন্দই যেন বেশি ডানা মেলছে।’
সব মিলিয়ে মাঠের নতুন বল, তীব্র গরম, ট্যাকটিক্যাল বিরতি আর একঝাঁক ক্ষুধার্ত স্ট্রাইকার— সব উপাদান এক হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপকে রূপ দিয়েছে গোলদাতাদের স্বর্গরাজ্যে।




