তেলের ভর্তুকি কমায় বিক্ষোভ
৫০ দিন পর বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা জারি

সংগৃহীত ছবি
প্রায় ৫০ দিনের টানা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে স্থবির বলিভিয়ার অর্থনীতি। এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ।
শনিবার ভোরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে এ ঘোষণা দেন তিনি।
বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টের ভাষ্য, সরকারবিরোধী অবরোধ আর সামাজিক আন্দোলন নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করার একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা এটি। এমন পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জরুরি পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় নেওয়া হয়েছে এমন পদক্ষেপ।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পরই বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ অপসারণে অভিযান শুরু করে কর্তৃপক্ষ। গত ৫০ দিনের বিক্ষোভে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ সরবরাহ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রশাসনিক রাজধানী লা পাজ এবং পার্শ্ববর্তী এল আল্টো শহর।
এল আল্টোতে শনিবার সকালে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে প্রধান মহাসড়কের দিকে রওনা হয় ট্রাক, মোটরসাইকেল ও ট্র্যাক্টরের একটি বহর। এর আগে এখানে নিয়মিত অবরোধ দিয়ে আসছিল বিক্ষোভকারীরা।
অবরোধ অপসারণের দৃশ্য দেখে স্থানীয় বাসিন্দা ৬৫ বছরের এলভিরা দে মামানি বলেন, ‘অনেক কষ্ট সহ্য করেছি আমরা। সবকিছু পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। আমাদের আশপাশের সবাই এতে একমত।’
অন্য এক অবরোধস্থলে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা ট্রাকচালকেরা সড়ক খুলে দেওয়ার সময় ‘আমরা জ্বালানি চাই’ স্লোগান দিতে থাকেন। তবে এল আল্টোর অন্য এলাকায় বহু মানুষ সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন জানান বিক্ষোভের প্রতি।
চোখের জল মুছতে মুছতে ফোরতুনাতা পেরেজ বলেন, ‘জীবিকা ও খাদ্যের জন্য লড়াই করার অধিকার আমাদের আছে। আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য লড়ব, যাতে সবকিছু বেসরকারিকরণ না হয়ে যায়।’
জরুরি অবস্থার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন সরকার ও বিরোধী দলের অনেক নেতা। ডানপন্থী বিরোধী দল আলিয়ান্সা লিব্রের আইনপ্রণেতা লিসা ক্লারোসের ভাষ্য, ৫০ দিনের অবরোধের পর প্রয়োজন ছিল এটি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণহানি ঘটেছে। তবে আশা করা যায়, এর মাধ্যমে দেশে ফিরবে শৃঙ্খলা ও শান্তি।
তবে কয়েকজন বিরোধী আইনপ্রণেতা, বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে জরুরি ক্ষমতার প্রয়োগ জনসমর্থন না পেলে এবং বিক্ষোভের মূল কারণগুলো সমাধান না করলে পরিস্থিতি হতে পারে আরও উত্তপ্ত।
প্রেসিডেন্ট পাজের দাবি, ‘এটি মানুষের জীবনযাপনের সুযোগকে সীমিত করার জন্য দেওয়া জরুরি অবস্থা নয়। বরং মানুষের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দেওয়া জরুরি অবস্থা। যারা রাজনৈতিক সংঘাতকে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করছে এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে, তাদের হাত থেকে বলিভিয়াকে মুক্ত করার উদ্যোগ এটি।’
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে জারি করা হয়নি কোনো কারফিউ। তবে দেশের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিবেচনা করা হচ্ছে অস্থায়ী চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং জনসমাবেশে সীমাবদ্ধতার মতো বিশেষ ব্যবস্থা। খনি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্বাভাবিক রয়েছে দেশের খনি কার্যক্রম।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে দেশের প্রধান শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছায় সরকার। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসপন্থী গ্রামীণ সংগঠনগুলো ওই আলোচনার অংশ নেয়নি। বিশেষ করে কোচাবাম্বা অঞ্চলে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে তারা এবং এখনো বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তাদের হাতে।
প্রসঙ্গত, সংকটের সূত্রপাত হয় জ্বালানি ভর্তুকি হঠাৎ কমিয়ে দেওয়ার পর। বাজেট ঘাটতি কমানো, ডলারের সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আলোচনার প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত। পরে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল করা এবং বিতর্কিত ভূমি সংস্কার নীতির কিছু অংশ থেকে সরকার সরে এলেও বাড়তে থাকে বিক্ষোভ। মজুরি বৃদ্ধি, জ্বালানি ও ডলারের সংকট নিরসন এবং পাজের পদত্যাগ দাবি করছে শ্রমিক সংগঠনগুলো।
প্রায় দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা সমাজতন্ত্রপন্থী সরকারের ধারাবাহিকতার অবসান ঘটিয়ে মাত্র সাত মাস আগে ক্ষমতায় আসেন পাজ। তার অভিযোগ, এই অস্থিরতা উসকে দিচ্ছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস। তবে সেই অভিযোগ অস্বীকার করে মোরালেস বলেন, চলমান ‘আদিবাসী বিদ্রোহ’ মূলত অর্থনৈতিক দুর্ভোগের ফল। আগাম নির্বাচনেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
দেশটির আইন বলছে, জরুরি অবস্থার আদেশ জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হবে প্রেসিডন্টের। এরপর কংগ্রেসের হাতে থাকবে ৭২ ঘণ্টা, যার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন বা বাতিল করতে পারবে তারা।




