ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
বিশ্ব মানচিত্রে নয়া খেলোয়াড়

সংগৃহীত ছবি
এইতো মাত্র কয়েক মাস আগেও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী সামরিক শক্তি ইসরায়েল নিজেদের বিজয়ের গল্প লিখতে প্রস্তুত ছিল। ওয়াশিংটনের ক্ষমতার করিডরে আত্মবিশ্বাসের ঝড়, তেল আবিবে বিজয়ের উল্লাস। তাদের ধারণা ছিল, ইরানকে চাপে ফেলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে; কিন্তু ইতিহাস মাঝেমধ্যে এমন বাঁক নেয়, যেখানে বিজয়ীর মুকুট পরে শেষপর্যন্ত পরাজিতই দাঁড়িয়ে থাকে।
আজ পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, অনেক বিশ্লেষকের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ শুধু ব্যর্থই হয়নি; বরং বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্যকেই নতুনভাবে সাজিয়েছে। যে ইরান কয়েক মাস আগেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার চাপে নুয়ে পড়েছিল, সেই ইরান এখন নতুন প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে উঠে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের শেষে যে চুক্তি, তা কি আসলেই আত্মসমর্পণের দলিল
যুদ্ধের পর স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক এখানেই। সমালোচকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তি মেনে নিয়েছে যেখানে ইরান উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে যাচ্ছে। স্থগিত তহবিল ব্যবহারের সুযোগ, তেল রপ্তানিতে শিথিলতা, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে নতুন সুযোগ— এসব সুবিধা কয়েক মাস আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। অথচ এর বিনিময়ে ইরান শুধু আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এখানেই সমালোচকদের প্রশ্ন— যদি শেষ পর্যন্ত এমন ছাড়ই দিতে হয়, তাহলে যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল কেন?
ট্রাম্প কী পেলেন, আর কী হারালেন
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ছিল শক্তি প্রদর্শন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ফল হয়েছে উল্টো। তাদের যুক্তি হলো, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে, প্রাণহানি ঘটেছে, সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর চাপ বেড়েছে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন মিত্রদের মধ্যেও ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিশ্বের সামনে মার্কিন শক্তির সেই অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ যুদ্ধের শুরুতে যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তার বেশিরভাগই অর্জিত হয়নি।
হরমুজ প্রণালি: ইরানের নতুন কৌশলগত অস্ত্র
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই সরু জলপথ শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিরা। যুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে এখানেই।
ইরান এখন বুঝে গেছে যে, হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব কতটা শক্তিশালী কূটনৈতিক অস্ত্র হতে পারে। আগে যেখানে নিষেধাজ্ঞা ও চাপের মুখে তেহরান প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে ছিল, এখন তারা এই জলপথকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে দরকষাকষির নতুন সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ ইরানের সামরিক শক্তি যতটা না বাড়িয়েছে, তার চেয়েও বেশি বাড়িয়েছে কৌশলগত গুরুত্ব।
চীনের জন্য কি এটি একটি বড় সুযোগ
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শূন্যস্থান কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কোনো শক্তি দুর্বল হলে অন্য শক্তি সেই জায়গা পূরণ করার চেষ্টা করে।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে চীন। বেইজিং এরই মধ্যে বুঝে গেছে যে, ট্রাম্প প্রশাসনের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা হলো অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভয়। শেয়ারবাজার, জ্বালানির দাম কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা— এসব বিষয়ে হোয়াইট হাউজ অত্যন্ত সতর্ক। ফলে ভবিষ্যতে তাইওয়ান, বাণিজ্য যুদ্ধ বা প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার মতো ইস্যুতে চীন আরও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিতে পারে।
নেতানিয়াহুর কৌশলগত ভুল
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বহু বছর ধরে ইরানকে দেশের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
গত কয়েক বছরে ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সামরিক অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক মিত্রদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও পেয়েছিল। ফলে নেতানিয়াহুর ধারণা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য স্থায়ীভাবে ইসরায়েলের পক্ষে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, এ যুদ্ধ সেই অগ্রগতির অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে। কারণ, যুদ্ধের ফলে ইরান পুরোপুরি ভেঙে পড়ার বদলে নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কেও নতুন ধরনের উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
দশকের পর দশক ধরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্ককে প্রায় অবিচ্ছেদ্য হিসেবে দেখা হয়েছে; কিন্তু এ সংঘাতের পর সেই সম্পর্কেও পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে।
এরই মধ্যে মার্কিন রাজনীতির ভেতরে, বিশেষ করে তরুণ ভোটার ও কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠীর মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে। আগে যা ছিল রাজনৈতিক সম্পদ, তা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দায়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। এটি যদি দীর্ঘমেয়াদে সত্যি হয়, তাহলে তা ইসরায়েলের জন্য সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। বিশ্ব ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধ শুরু করা যায়; কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আফগানিস্তান, ইরাক, ভিয়েতনাম— প্রতিটি সংঘাতই এই সত্যের সাক্ষী।
ইরানকে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিয়েছে। এটি ইরানকে নতুন দরকষাকষির ক্ষমতা দিয়েছে, চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে এবং ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সব মিলিয়ে এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো একটাই— সামরিক শক্তি সবসময় রাজনৈতিক সাফল্য এনে দেয় না। কখনো কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে ছোড়া একটি বোমা বিশ্বরাজনীতির এমন এক শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যার ফল ভোগ করতে হয় বছরের পর বছর। আর সেই বাস্তবতাই আজ নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের এই অধ্যায়।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়




