বিশ্ব সংগীত দিবস আজ
একদিকে উদ্যাপন, অন্যদিকে সংগীত শিক্ষায় আপত্তি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আজ ২১ জুন, বিশ্ব সংগীত দিবস। এবার দিবসটি উদ্যাপনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় দুদিনের সংগীত উৎসব আয়োজন করেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এ ছাড়া ভাবনগর ফাউন্ডেশনসহ আরও কয়েকটি সংগঠনের আয়োজনেও সংগীত দিবস উদ্যাপনের ভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।
একদিকে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে সংগীত দিবস উদ্যাপনের প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে একটি খবর সংগীতাঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অসম্মতির কারণে থেমে আছে।
দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সংগীত শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের দ্বিধা থাকা উচিত নয়। সংগীত বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, উদার হতে শেখায়।’
বিএনপির সরকার উদার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যাশা করি। কিন্তু যখন সংগীত শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সরকার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়, তখন সরকারের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। -জামসেদ আনোয়ার তপন, আহ্বায়ক, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রধান প্রিয়াঙ্কা গোপের ভাষ্য, ‘সংগীত মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল মন ও চিন্তা গড়তে সহায়ক।’ তিনি আগামীর সময় বলেছেন, ‘যারা সংগীতকে নেতিবাচকভাবে দেখে, তাদের সঙ্গেও যদি আমাদের কথা হয়, তবে তাদের বোঝাব সংগীত নেতিবাচক নয়।’
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার প্রাথমিকে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিলে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক পাঁচটি দলের নেতারা আপত্তি জানান। সেপ্টেম্বর মাসে এক সেমিনারে তারা বলেছিলেন, ‘সংগীত শিক্ষকের জায়গায় সরকারকে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।’
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা কে এম শরীয়তউল্লাহ বলেছিলেন, সংগীত কোনো ম্যান্ডেটরি শিক্ষা হতে পারে না। কিন্তু ধর্মশিক্ষা না থাকার কারণে মানুষর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।’
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে লেখাপড়ার অংশ হয়ে আছে সংগীত, চারু ও কারুকলা এবং শারীরিক শিক্ষা।
‘শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে শারীরিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৬ সালে প্রাথমিক শিক্ষক নির্দেশিকায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সংগীত বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘মানবিক গুণাবলি বিকাশের জন্য সংগীতের ভূমিকা অনস্বীকার্য’, যোগ করেন তিনি।
২০২০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগে একটি প্রস্তাব তৈরি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। যার ভিত্তিতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ দুই বিষয়ে ৫ হাজার ১৬৬ জন শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাবে সম্মতি দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
গত বছর ২৮ আগস্ট চারটি পদের নাম উল্লেখ করে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। যেখানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পাশাপাশি সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়।
সংগীত শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের দ্বিধা থাকা উচিত নয়। সংগীত বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, উদার হতে শেখায়। -ডা. সারওয়ার আলী, সভাপতি, ছায়ানট
প্রাথমিক স্কুলে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষাবিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিলে কয়েকটি ধর্মভিত্তিক সংগঠনের আপত্তির মুখে সরে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছর বিএনপি সরকার গঠন করার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দিতে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, যা বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদে আটকে রয়েছে।
গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের আহ্বায়ক জামসেদ আনোয়ার তপন আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিএনপির সরকার উদার গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা অব্যাহত রাখবে বলে প্রত্যাশা করি। কিন্তু যখন সংগীত শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে সরকার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়, তখন সরকারের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে সৃজনশীল ও মননশীল করে গড়ে তোলার জন্য আশা করব, প্রাথমিকে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেবে বর্তমান সরকার।’






