হামের টিকার লক্ষ্য নির্ধারণেই গলদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হাম সংক্রমণ নিয়ে সরকারি কাগজের তথ্য ও বাস্তব চিত্রে রয়েছে বড় ফারাক। হাম নিয়ন্ত্রণে দেওয়া টিকার তথ্য নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। সরকার বলছে, টিকা কাভারেজ লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা দেওয়ার কথা বলা হলেও লাগাম পরানো যায়নি সংক্রমণে। প্রতিদিনই নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আটটি বিভাগে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ েজন লক্ষ্যভুক্ত শিশুর বিপরীতে টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭২ হাজার ৮৩৭ শিশু। অর্থাৎ টিকার কাভারেজ দাঁড়িয়েছে ১০৩ শতাংশ। কিন্তু এই সাফল্যের দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির একটি বড় অসংগতি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের তথ্যের ভিত্তিতে কিছু যোগ-বিয়োগ করে টিকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তব চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মাঠপর্যায়ের সরেজমিন কাজের বদলে অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে অনলাইন মিটিং ও ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে। ফলে অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ১০৩ শতাংশ টিকা কাভারেজ থাকার পরও এ বিভাগে তিন মাসে ২৯৮ শিশু মারা গেছে। ৪৯ হাজার ৪০৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭৬ জন। পরে চট্টগ্রামে টিকার কাভারেজ ১০৪ শতাংশ; কিন্তু মারা গেছে ৫৯ শিশু। রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩২৩ এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৪ হাজার ৪৯৮ জন। রাজশাহীতে টিকার কাভারেজ ১০৩ শতাংশ; মৃত্যু ৮৯ জন। এ ছাড়াও রংপুর, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহে টিকার কাভারেজ ১০০ শতাংশের ওপরে। অন্যদিকে সিলেট বিভাগের কাভারেজ ৯৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, যদি সত্যিই টিকার কাভারেজ ১০৩-১০৬ শতাংশ হয়ে থাকে, তাহলে এখনো কেন এভাবে সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে? কোথায় ভাঙছে বাংলাদেশের হাম প্রতিরোধ ব্যবস্থা?
গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা সংগ্রহ পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তনের ফলে হামের টিকাদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কি না, তা প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ৫ এপ্রিল যখন দেশের ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, তখন ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৪ জন। এক মাস পর ৫ মে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৪৫ জনে। আর গতকাল ১৯ জুনও রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭৪ জন। অর্থাৎ টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। জানা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ শুরু করে। ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬৭০ শিশু। একই সময়ে প্রায় ৭৫ হাজার ১৫৬ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময় হাম ও এর উপসর্গে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ৪৫১ জন।
টিকার কাভারেজের হিসাবে ও বাস্তব টিকাদানের মধ্যে একটা ফারাক রয়েছে উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেছিলেন, একশ নয়— যদি ৯০ শতাংশের ওপরে টিকা কাভারেজে আসত তাহলে দেশে হামের রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে যেত। তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন শিকদার বললেন, হামের টিকা নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ১২ মাস বয়সের মধ্যে গ্রহণ করার কথা থাকলেও অনেক শিশু তা পাচ্ছে না। ফলে টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাগ্রহণকারী শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের মাধ্যমে রোগটি আশপাশের মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বললেন, টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের কারণে কমিউনিটিতে একটি ‘কমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হচ্ছে, যা হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন হামের টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে বলেছেন, জরুরি পরিস্থিতির কারণে টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। সাধারণত মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তালিকা তৈরি করেন। কিন্তু এবার সে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গত বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কিছু যোগ-বিয়োগ করে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের সরেজমিনে কাজের পরিবর্তে অনেক সিদ্ধান্তই অনলাইন মিটিং বা ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মাঠপর্যায়ে সঠিক তালিকা তৈরি না হওয়ায় এখন যারা টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি। বিশেষ করে যাদের দ্বিতীয় ডোজ বাকি রয়েছে, তাদের টিকা নিশ্চিত না করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যবিধি মানার ঘাটতিও সংক্রমণ বাড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। তিনি বললেন, হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে কারা হামে আক্রান্ত এবং কারা নয়— তা আলাদা করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। একইভাবে জ্বরের রোগীদের আলাদা করে রাখা, পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখা বা আইসোলেশন— কোয়ারেন্টাইনের মতো মৌলিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে রোগী থেকে রোগীতে সংক্রমণ ছড়িয়েছে অবাধে।




