সাক্ষাৎকার
হৃদরোগের চিকিৎসায় অত্যাধুনিক সুবিধা এখন দেশেই

ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক ও ডা. মোহাম্মদ রাফিউর রহমান
প্রতি বছর ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষ হার্টের রোগে মারা যান। বিশ্ব হার্ট দিবস উপলক্ষে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও আধুনিক সুবিধা চালু রয়েছে। হাসপাতালের ক্যাথল্যাবে কিউএফআর ও বাইপ্লেন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা জরুরি হৃদরোগ চিকিৎসা, সিপিআর ও হৃদরোগীদের পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু রয়েছে। হাসপাতালে হৃদরোগীদের চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, হৃদরোগের ঝুঁকি ও প্রতিরোধের বিষয়ে কথা বলেছেন কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক এবং কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মোহাম্মদ রাফিউর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আগামীর সময় প্রতিবেদক কাউসার আহমেদ
আগামীর সময়: হার্ট অ্যাটাকের রোগী হাসপাতালে এলে দ্রুত চিকিৎসার জন্য আপনাদের প্রটোকল কী?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: জরুরি বিভাগে হার্ট অ্যাটাকের রোগী এলে আমাদের বিশ্বমানের ইমার্জেন্সিতে দ্রুত পরীক্ষা করে সিসিইউতে নেওয়া হয়। প্রয়োজন হলে বন্ধ রক্তনালি খুলে রিং পরানো হয়, যা সাধারণত রোগীর পরিবারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ৩০ মিনিটের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ২৪ ঘণ্টা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ ১৬ শয্যার সিসিইউ রয়েছে। এর চারটি শয্যায় ডায়ালাইসিস ও কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসসহ মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে।
আগামীর সময়: ক্যাথল্যাবে কী কী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: ক্যাথল্যাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। অ্যালিয়া আইজি ৫ মেশিনের কিউএফআর প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্তনালিতে ব্লকের কারণে রক্তপ্রবাহের অবস্থা জানা যায়। সিমেন্স বাইপ্লেন প্রযুক্তিতে কম কনট্রাস্ট ব্যবহার করে দ্রুত বিভিন্ন দিক থেকে ছবি নেওয়া যায়, যা কিডনি রোগীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক পরীক্ষা, ২৪ ঘণ্টা হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ, ব্যায়াম ও ওষুধের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের সক্ষমতা পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া হৃৎপিণ্ডের সার্বিক পর্যালোচনার জন্য ইসিজি, ২৪ ঘণ্টা হল্টার মনিটর (হৃৎস্পন্দন পরীক্ষা), ২৪ ঘণ্টা রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ, ইটিটি, শারীরিক ব্যায়াম কিংবা ওষুধের মাধ্যমে হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা, ইকোকার্ডিওগ্রামসহ বিভিন্ন আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
আগামীর সময়: তরুণদের মধ্যে হৃদরোগ বাড়ার কারণ কী?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ধূমপান ও পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস বড় ঝুঁকি। পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা না করাও ক্ষতিকর।
আগামীর সময়: বুকের ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে অবহেলার ঝুঁকি এবং হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: বুকের মাঝখানে চাপ বা চেপে ধরার মতো অনুভূতি, গলা বা হাতে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট হলে সেটিকে শুধু গ্যাস্ট্রিক মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। বুকের মাঝখানে চাপ বা চেপে ধরার মতো অনুভূতি, গলার দিকে চাপ, চোয়াল থেকে বুক বা পেটের দিকে অস্বস্তি এবং হাতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট, বুক অস্বাভাবিক ধড়ফড়, পা ফুলে যাওয়া এবং হঠাৎ মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়াকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
আগামীর সময়: অল্প বয়সে হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে করণীয় কী এবং শিশুদের হৃদরোগে কী সমস্যা দেখা যায়?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: পরিবারে কারও ৫৫ বছরের নিচে হার্ট অ্যাটাক, বাইপাস বা রিং পরানোর ইতিহাস থাকলে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী সদস্যদের আগাম স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। অনেক সময় রোগীরা উপসর্গকে গুরুত্ব না দিয়ে গ্যাস্ট্রিক মনে করে দেরি করেন। জীবনযাপন ও হৃদরোগের ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। শিশুদের হৃদরোগের ক্ষেত্রে জন্মগত হৃদযন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি, বংশগত কারণ ও হৃৎস্পন্দনের সমস্যা থাকতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
আগামীর সময়: হৃদরোগ প্রতিরোধে হাসপাতাল কী কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের কী করা উচিত?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: আমরা সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জরুরি অবস্থায় জীবন রক্ষার প্রাথমিক চিকিৎসা বা সিপিআর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। হৃদরোগীদের চিকিৎসার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পুনর্বাসন কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে ঘরের তৈরি খাবার, শাকসবজি, সালাদ ও ফলমূল বেশি খাওয়া ভালো। চর্বিযুক্ত লাল মাংস কমিয়ে মাছ খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।
আগামীর সময়: মানসিক চাপ হৃদরোগে কী প্রভাব ফেলে?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কাজ শেষ করার পর কাজের চিন্তা থেকে নিজেকে কিছুটা মুক্ত রাখতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিজের জন্য সময় রাখা প্রয়োজন।
আগামীর সময়: আগামী ৩ থেকে ৫ বছরে হৃদরোগ চিকিৎসায় কী পরিকল্পনা রয়েছে?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: আমরা সমন্বিত ‘হার্ট টিম’ পদ্ধতিতে চিকিৎসা আরও উন্নত করতে চাই। ভবিষ্যতে ইসিএমও প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরে জটিল রোগীদের জন্য এলভিএডি এবং হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের দিকেও এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।
আগামীর সময়: বিশ্ব হার্ট দিবসে সাধারণ মানুষের জন্য আপনার বার্তা কী?
ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ আতিক: হৃদরোগ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ধূমপান বন্ধ করতে হবে, নিয়মিত হাঁটতে হবে এবং ওজন, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
আগামীর সময়: কার্ডিয়াক সার্জারির ক্ষেত্রে বছরে গড়ে কতটি অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে? এর মধ্যে কোন ধরনের জটিল অস্ত্রোপচার বেশি হচ্ছে?
ডা. মোহাম্মদ রাফিউর রহমান: গত এক বছরে আমাদের হাসপাতালে ১০০ জনের বেশি রোগীর হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই বাইপাস সার্জারি। এ ছাড়া ভালভ প্রতিস্থাপন, জন্মগত হৃৎপিণ্ডের ছিদ্র মেরামত এবং বুক না কেটে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচারও করা হচ্ছে।
আগামীর সময়: এসব হৃদযন্ত্রে অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোগীদের খরচ কেমন হচ্ছে? বাইপাসসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচারের প্যাকেজ কত?
ডা. মোহাম্মদ রাফিউর রহমান: অন্যান্য বড় বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় আমাদের এখানে খরচ কিছুটা কম। বাইপাস সার্জারির ক্ষেত্রে একক কেবিনের প্যাকেজ ৪ লাখ এবং শেয়ারড কেবিনের প্যাকেজ ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারিত।




