১০ টাকার টিকিটে মিলছে শতকোটির চিকিৎসা, আছে ভোগান্তিও
- ‘চক্ষুযুদ্ধ’ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে
- আইএমইডির নিজস্ব জরিপ অনুযায়ী হাসপাতালে আসা মাত্র ৮ শতাংশ রোগী প্রথমবার এসে সেবা পান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোগান্তির একশেষ। টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়াতেই চোখ আটকে যায়— চোখের আলো ফেরানোর অপেক্ষায় থাকা কয়েকশ মানুষের দীর্ঘ সারিতে। কোনোরকমে চিকিৎসকের দেখা মিললেও সেদিন আর জোটে না পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এর জন্য আবার ছুটতে হয় পরদিন।
এন্তার ভোগান্তি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং নানামুখী অনিয়ম সত্ত্বেও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ছুটে আসছেন। কারণ, সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের বেসরকারি ব্যয়বহুল হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই। মাত্র ১০ টাকার টিকিট কেটে শতকোটি টাকার সর্বাধুনিক অবকাঠামো ও বিশেষজ্ঞদের সেবা পাওয়ার সুযোগটাই তাদের কাছে কোটি টাকার সমান ভরসা— যেখানে গেলে চোখ ভালো হওয়ার আশায় বুক বাঁধেন তারা।
যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে একটি রেটিনা লেজার চিকিৎসায় প্রায় ১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে এই সরকারি হাসপাতালে নির্দিষ্ট কিছু লেজারের ফি মাত্র ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। একইভাবে, রেটিনার জটিল রোগে ব্যবহৃত ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা মূল্যের বিশেষ ইনজেকশন সরকারি ব্যবস্থাপনায় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনামূল্যে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া, বেসরকারি হাসপাতালে ছানি অপারেশনে লেন্স ও পদ্ধতিভেদে ১৫ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হলেও এই হাসপাতালে মিলছে বিনামূল্যে। গ্লুকোমার লেজার পেরিফেরাল ইরিডোটমি (পিআই) চিকিৎসার ফি এখানে দুই চোখের জন্য মাত্র ১ হাজার, যা বেসরকারি হাসপাতালে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। শুধু চিকিৎসায় নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও নামমাত্র। রেটিনার অবস্থা জানতে অপটিক্যাল কোহেরেন্স টমোগ্রাফি (ওসিটি); কিংবা চোখের রক্তনালির ফান্ডাস ফ্লুরোসিন এনজিওগ্রাফি (এফএফএ) পরীক্ষার ফি সরকারি হাসপাতালে এক চোখ ৬০০ ও দুই চোখের জন্য ১২০০ টাকা, যা বেসরকারিতে কয়েক হাজার টাকা। আর বি-স্ক্যান আলট্রাসনোগ্রাফির সরকারি ফি এক চোখে মাত্র ২০০ এবং দুই চোখের জন্য ৪০০ টাকা। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে এমন শতকোটি টাকার সেবার সুযোগ থাকাতেই রোগীরা ছুটে আসছেন এখানে।
মূলত এই বিশাল সুবিধা ও ভরসার কারণেই চরম দুর্ভোগ, সুদীর্ঘ অপেক্ষা আর প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা জানা সত্ত্বেও প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী ছুটে আসছেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এই হাসপাতালে। তবে এই আশার আলোর পেছনে রোগীদের করতে হচ্ছে এক অবর্ণনীয় ‘চক্ষুযুদ্ধ’।
রোগীদের এই দুর্ভোগের সত্যতা উঠে এসেছে স্বয়ং পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনেও। আইএমইডির নিজস্ব জরিপ অনুযায়ী, হাসপাতালে আসা মাত্র ৮ শতাংশ রোগী প্রথমবার এসে সেবা পান। বাকি ৯২ শতাংশকে চিকিৎসা সম্পন্ন করতে কয়েকবার, এমনকি চারবার পর্যন্ত হাসপাতালে আসতে হতে হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্পটি মাত্র তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও লেগেছে ১৬ বছর। ২০০৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্প সাত দফা সময় বাড়িয়ে ২০১৯ সালে শেষ হয়।
দীর্ঘ সময় ও কোটি কোটি অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ের পরও হাসপাতালের জনবল এবং সরঞ্জাম সংকট কাটেনি। আইএমইডির মূল্যায়নে চিকিৎসক, নার্সসহ ১৫৪টি পদ শূন্য থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্পের আওতায় কেনা ৭০ ধরনের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির মধ্যে বেশ কয়েকটি উচ্চমূল্যের যন্ত্র বর্তমানে অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। ফলে জটিল অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে মূল চিকিৎসাসেবা।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের অমানবিক দুর্ভোগের চিত্র। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগীরা একটু আগেভাগে সেবা পাওয়ার আশায় শেষ রাতে বা ভোরে এসে হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে ভিড় জমান। সকাল ৯টায় গেট খুলতেই টিকিট কাটার কাউন্টারে শুরু হয় ধস্তাধস্তি।
একজন রোগী প্রাথমিক টিকিট কাটার পর যদি চিকিৎসকের কাছে যান, সেখান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা অন্য কোনো কক্ষে রেফার করা হলে তাকে একে একে অন্তত তিন-চারটি ভিন্ন কক্ষের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হয়। এতে টিকিট কাটা থেকে শুরু করে সেবা শেষ করে বের হতে সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে যায়। কিন্তু দুপুর ১টা বাজতেই ঝিমিয়ে পড়ে সব কার্যক্রম, আর দুপুর ২টা বাজার আগেই কক্ষগুলোতে ঝুলতে থাকে তালা।
রাজধানীর পূর্ব তেজতুরীপাড়ার বাসিন্দা শাহাদাত হোসেনের অভিজ্ঞতা সেটিরই জ্বলন্ত প্রমাণ। কয়েক দিন ধরে চোখে ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথা নিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। ১০ টাকার টিকিট কেটে ১১৯ নম্বর কক্ষে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলল চিকিৎসকের দেখা। কিন্তু পরীক্ষা শেষে স্লিপ নিয়ে নার্সের কাছে যেতেই জানানো হয়— সেদিন আর সেবা সম্ভব নয়, শনিবার আসতে হবে।
কথা অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টায় আবার হাসপাতালে এসে ২২১ নম্বর কক্ষের সামনে দাঁড়ান শাহাদাত। চিকিৎসকের পরামর্শে চশমা পরীক্ষার জন্য ২২৭ ও ২২৬ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখেন, রোগীদের দীর্ঘ লাইন গেট পর্যন্ত ঠেকেছে।
বরিশাল থেকে আসা (অব.) সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামও দীর্ঘ অপেক্ষার শিকার। দুপুর ১২টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে একপর্যায়ে দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে বসে পড়েন তিনি। ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘দুটি কক্ষের একটি বন্ধ থাকায় রোগীদের চাপ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমরা বয়স্ক মানুষ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কি সম্ভব?’
হাসপাতালের ২৩৭ নম্বর কক্ষের সামনে চেয়ারে পাঁচ বছরের শিশুকন্যা সালমাকে কোলে নিয়ে অসহায় হয়ে বসে ছিলেন আবদুর রহমান মোল্লা। মেয়ের চোখের লেন্স পড়ে গেছে। হতাশার সুরে তিনি বললেন, ‘আজ না কাল— এমন ডেট দিতে দিতে মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে ১৫ দিন কেটে গেল।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টায় ২২১ নম্বর রুমে অপারেশনের তারিখ জানার জন্য ফাইল জমা দেন তিনি। দুপুর ২টা পর্যন্ত বারবার খোঁজ নিয়েও মেলেনি নির্দিষ্ট তারিখ। আবদুর রহমান অভিযোগ করে বললেন, “টিকিট কাটা থেকে শুরু করে এক্স-রে করা এবং ফাইল জমা দেওয়া— প্রতিটি কাজের জন্য এক রুম থেকে অন্য রুমে দৌড়াতে হয়। কিন্তু ‘চানাচুর-মুড়ির টাকা’ (ঘুষ) দিলেই ১০ মিনিটে কাজ হয়ে যায়। টাকা না দিলে লাইন এগোয় না।”
সূত্রে জানা যায়, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে অনুমোদিত ২৫১টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত ২১০ এবং ডাক্তার রয়েছেন ১৮৩ জন। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে চার হাজার নতুন এবং প্রায় দুই হাজার পুরনো রোগী আসেন। কারণ ১০ টাকার টিকিটের মেয়াদ থাকে পুরো এক বছর। ফলে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন গড়ে ১২০-১৫০ জন রোগী দেখতে হয়।
সার্বিক ভোগান্তি নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বললেন, ‘আমাদের জনবল ও অবকাঠামোগত যে সক্ষমতা রয়েছে, এর তুলনায় ১০ গুণ বেশি রোগী এখানে সেবা নিতে আসেন। বহির্বিভাগে অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকায় অনেকেই একই দিনে পুরো চিকিৎসা শেষ করতে পারেন না। এক রুমের সিরিয়াল শেষে অন্য রুমে যেতে যেতে দুপুর হয়ে যায়।’ রোগীদের এই চরম ভোগান্তি কমাতে এবং হাসপাতালের কার্যক্রমে গতি আনতে আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু জোরালো সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— হাসপাতালের টিকিট ও ফাইল ডিজিটালাইজেশন করা, কর্মীদের আচরণগত প্রশিক্ষণ দেওয়া, সেবার সময় বাড়িয়ে বিকাল ৫টা পর্যন্ত করা এবং দুই শিফটে হাসপাতালের বহির্বিভাগ চালু রাখা।



