প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনে বেড়েছে তৎপরতা, কাটেনি অব্যবস্থাপনা

সংগৃহীত ছবি
সকাল সাড়ে ৮টা। রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই একটু অন্যরকম মনে হলো। চারপাশ বেশ পরিচ্ছন্ন। মাটিতে পড়ে নেই কাগজের টুকরো, গাছের নিচে জমে নেই শুকনো পাতা। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের সামনের জায়গাও পরিষ্কার। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এদিক-সেদিক ঘুরে দেখছেন, কোথাও ময়লা পড়ে আছে কি না।
নতুন কেউ গেলে ভাববেন, হাসপাতালটি বুঝি সবসময়ই এমন পরিচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু পুরনো রোগী বা দর্শনার্থীরা জানেন বাস্তবতা। তাহলে এই পরিবর্তনের কারণ কী? কারণ হলো, গত শনিবার হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আর তার পরিদর্শনের পরই যেন বদলে গেছে চিত্র।
কিন্তু রবিবার সকাল ১০টা বাজতে না বাজতেই সেই পরিচ্ছন্নতার ছবিতে দেখা গেল ফাটল। হাসপাতালের বাইরে কোথাও পড়ে আছে পানির বোতল, কোথাও ব্যবহৃত টিস্যু, চিপসের প্যাকেট কিংবা খাবারের উচ্ছিষ্ট। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সেগুলো সরাতে ব্যস্ত। এক জায়গা পরিষ্কার করতে না করতেই অন্য জায়গায় জমছে নতুন আবর্জনা। হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে রীতিমতো দৌড়াতে হচ্ছে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের।
এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী আগামীর সময়কে বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার পর স্যারদের কড়া নির্দেশ— সারাক্ষণ পরিষ্কার করতে হবে। আমরা সেই চেষ্টা করছি। কিন্তু রোগী আর তাদের স্বজনদের চাপ বাড়লে পরিষ্কার রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা কেউ তো নিয়ম মানেন না। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেন।’
শুধু বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট নয়; প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শনের পর রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালেও বেড়েছে পরিচ্ছন্নতার তৎপরতা। কোথাও ময়লা-আবর্জনা সরানো হয়েছে, কোথাও দেয়ালে চলছে রং করার কাজ, কোথাও গঠন করা হয়েছে তদারকি কমিটি।
গত শনিবার হাসপাতালগুলো পরিদর্শন করে পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ঘাটতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চিহ্নিত ত্রুটি দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় দেন তিনি। এরপরই হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্নতার কাজ জোরদার হয়। তবে এই তৎপরতার মধ্যেও রয়ে গেছে পুরনো সমস্যা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের চাপ শেষ হওয়ার পরও কি একইভাবে পরিচ্ছন্ন থাকবে হাসপাতালগুলো?
শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরপরই পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ওয়ার্ড, টয়লেট ও বাইরের পরিবেশের জন্য একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতির কারণে তিন মাস ধরেই পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম চলছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর তা আরও জোরদার করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে চিহ্নিত ত্রুটি দূর করার চেষ্টা চলছে।’
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের পরদিন প্রাঙ্গণ, চলাচলের পথ, খোলা জায়গা ও উদ্যান জুড়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের তৎপরতা দেখা যায়। বাইরে থেকে হাসপাতালের পরিবেশ বেশ গোছানো মনে হলেও ভেতরের সব জায়গায় সেই পরিবর্তন আসেনি। বহির্বিভাগের পুরুষদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত একটি শৌচাগারসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের কয়েকটি বাথরুম তখনো অপরিচ্ছন্ন। রোগীর তুলনায় শৌচাগারের স্বল্পতাও স্পষ্ট।
হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক মীরজাহান গোলাম সারওয়ার জানালেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন নতুন টিকিট নিয়ে প্রায় চার হাজার রোগী আসেন। রিপোর্ট দেখানোসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে আসেন আরও আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী। সব মিলিয়ে প্রতিদিন সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার রোগীর চাপ থাকে।
‘এত মানুষের জন্য শৌচাগার পরিষ্কার রাখা বেশ কঠিন। বহির্বিভাগে শৌচাগারের সংখ্যাও সীমিত। রোগীদের পাশাপাশি হাসপাতালের কর্মীদেরও এগুলো ব্যবহার করতে হয়। জায়গার সংকটের কারণে শৌচাগারের সংখ্যা বাড়ানো কঠিন। বহির্বিভাগের জন্য আলাদা কমপ্লেক্স নির্মাণ কিংবা বিদ্যমান ব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে’— যোগ করলেন তিনি।
রাজধানীর উত্তরায় কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে পরিবর্তন ছিল আরও দৃশ্যমান। গত শনিবার হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ময়লা-আবর্জনা জমে ছিল। টয়লেটগুলো ছিল অপরিচ্ছন্ন, কোথাও জমে ছিল শেওলা। দুর্গন্ধে আশপাশে যাওয়া কঠিন ছিল। পরদিন রবিবার দেখা গেল পরিষ্কার প্রাঙ্গণ, দেয়ালে চলছে রং করার কাজ। ময়লা জমে থাকা কোনাগুলো পরিষ্কার করে ছিটানো হয়েছে ব্লিচিং পাউডার। চারতলার বিভিন্ন ওয়ার্ডের মেঝেও পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকটি টয়লেটের দরজা তখনো ভাঙা। কোথাও পানির কল নষ্ট হয়ে অনবরত পানি পড়ছে। হাসপাতালে ভর্তি স্ত্রীর পাশে থাকা দক্ষিণখানের বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম বলেছেন, ‘টয়লেটে দুর্গন্ধ ছিল। আশপাশেও স্যাঁতসেঁতে ভাব ছিল। প্রধানমন্ত্রী আসার পর থেকে সবাই কেন জানি সক্রিয় হয়েছেন।’
হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক মো. মিজানুর রহমান বলেছেন, সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এক সপ্তাহ আগে থেকেই হাসপাতাল সংস্কারের কাজ চলছিল। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পরিদর্শন করে গেছেন। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
তিন হাসপাতালের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রধানমন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন কর্তৃপক্ষের তৎপরতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। তবে পরিচ্ছন্নতা শুধু বিশেষ পরিদর্শনের সময় দেখানোর বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। রোগী ও স্বজনদেরও হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব। আবার অপর্যাপ্ত শৌচাগার, ভাঙা দরজা, নষ্ট পানির কলসহ অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হাসপাতালের। সেখানে নিয়মিত তদারকি, প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সাত দিনের সময়সীমায় কতটা ত্রুটি দূর হয়, তার চেয়েও বড় পরীক্ষা হবে সময়সীমা শেষ হওয়ার পর। তখনো যদি পরিচ্ছন্নতা বজায় থাকে, তবেই বোঝা যাবে পরিবর্তন স্থায়ী হয়েছে। অন্যথায় প্রধানমন্ত্রীর আগমনে হাসপাতাল পরিষ্কার হবে, তার চলে যাওয়ার পর আবার ফিরবে পুরনো চিত্র— কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে পরবর্তী কোনো পরিদর্শনের অপেক্ষায়।



