আদ্-দ্বীনের রোগীরা সেবা পাচ্ছেন না নির্ধারিত হাসপাতালে
- সবচেয়ে দুর্ভোগে কিডনি রোগী ও অন্তঃসত্ত্বারা

সংগৃহীত ছবি
লাইসেন্স বাতিলের পরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের রোগীদের ঢাকা মেডিকেলসহ ছয়টি সরকারি হাসপাতালে তাৎক্ষণিক ও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু নির্ধারিত এসব হাসপাতালে গিয়ে আদ্-দ্বীনের রোগী হিসেবে আলাদা কোনো সুবিধা পাননি রোগীরা। বরং সেবা পেতে তাদের নানা ধরনের ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
আদ্-দ্বীনের চিকিৎসাসেবার খরচ ঢাকার অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় কম ছিল। ফলে এই সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কম আয়ের রোগীরা। পাশাপাশি অসুবিধায় পড়েছেন এখান থেকে যারা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নিতেন। ভুক্তভোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছেন কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী এবং অন্তঃসত্ত্বারা।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন এমন কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তারা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্দেশনা দিলেও এসব হাসপাতালে গিয়ে কোনো বাড়তি সুবিধা মেলেনি। হাসপাতালের নির্ধারিত নিয়ম মেনেই তাদের সেবা নিতে হয়েছে, যা ছিল সময়সাপেক্ষ। কেউ কেউ দালালের মাধ্যমে সেবা নিয়েছেন। সেবা পেয়ে ফিরেও যেতে হয়েছে অনেককে। আবার সেবা না পেয়ে অন্য বেসরকারি হাসপাতালে বেশি খরচে চিকিৎসা নিতে বাধ্যও হচ্ছেন কেউ কেউ। রোগীদের অনেকেই আদ্-দ্বীনের মতো কম খরচের হাসপাতাল খুঁজে ফিরছেন।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর গত ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে এবং রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য ৭২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেয়। পরের দিনই অধিদপ্তরের পরিচালকের (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্দেশনা দেওয়া হয় যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট আদ্-দ্বীনের রেফার রোগীদের তাৎক্ষণিক ও যথাযথ চিকিৎসা দেবে।
দুই বছর ধরে সপ্তাহে দুবার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস করান রামপুরার পঞ্চাশোর্ধ্ব এক রোগী। হাসপাতালটি বন্ধ হলে তিনি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের জন্য যান। সেখানে তাকে আদ্-দ্বীনের রোগী হিসেবে কোনো বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়নি। বরং জরুরি বিভাগ থেকে জানানো হয়েছিল, এ রকম কোনো নির্দেশনার কথা তারা জানেন না। এখানে চিকিৎসা করাতে হলে অন্য রোগীদের মতোই সেবা নিতে হবে। পরে তিনি যান ঢামেক হাসপাতালে। সেখানেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় একই ধরনের কথা।
বেসরকারি চাকারিজীবী এই কিডনি রোগী বললেন, ‘এই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাতে নির্ধারিত দিনে তিনবার যেতে হয়। প্রথমে সকালে যেতে হয় সিরিয়ালের জন্য, দুপুরে শয্যার জন্য ও বিকালে ডায়ালাইসিস করাতে, যা চাকরিজীবীদের জন্য অসম্ভব।’ তাই বাধ্য হয়েই তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। যেখানে খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
আরেক কিডনি রোগী খরচ বাঁচাতে ঢামেক হাসপাতালেই ডায়ালাইসিস করাচ্ছেন। পেশায় শিক্ষক এই ডায়ালাইসিস রোগীর সিরিয়াল নিতে ও শয্যা নিশ্চিতে যান তার স্ত্রী। তিনি যান বিকালে। বাবা-মায়ের এই দৌড়ঝাঁপের কারণে সন্তানদের পড়তে হচ্ছে নানা ধরনের অসুবিধায়।
এই শিক্ষক বলছিলেন, ‘এত দৌড়াদৌড়ি করে ডায়ালাইসিস করানো সম্ভব নয়। আদ্-দ্বীনে নিয়মিত রোগী হিসেবে কম খরচে, নির্ধারিত সময়ে ডায়ালাইসিস করানো যেত, যা চাকরিজীবীদের জন্য খুব সুবিধাজনক ব্যবস্থা।’
আদ্-দ্বীনের রোগীদের এই অভিজ্ঞতার বিষয়ে কথা হয় ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ঢামেক হাসপাতালে রোগীর চাপ সবসময়ই বেশি থাকে। তাদের পক্ষে আদ্-দ্বীনের রোগীদের জন্য শয্যা বরাদ্দ রেখে বা অন্যভাবে আলাদা ব্যবস্থা রাখা সম্ভব নয়। হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ীই রোগীকে সেবা নিতে হবে। তবে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা রোগীর পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবে— জানালেন তিনি।
আদ্-দ্বীনে প্রসব-পূর্ববর্তী সেবা নিচ্ছিলেন ২৮ বছরের এক নারী। হাসপাতাল বন্ধের পর এখনো কোথাও সেবা নেওয়া শুরু করেননি সাত মাসের এই অন্তঃসত্ত্বা। দুই মাস পরে কোন হাসপাতালে কম খরচে সন্তান জন্ম দিতে পারবেন, সেটাও বুঝতে পারছেন না। এই হবু মায়ের আশা, তার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই চালু হয়ে যাবে বেসরকারি হাসপাতালটি।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ২৫-৩০ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস করানো হতো। গরিব রোগীদের জন্য মাত্র ২৫০ টাকায় এ সেবা মিলত। আর কয়েকটি প্যাকেজে সর্বোচ্চ খরচ হতো ২৭০০ টাকা। এ ছাড়া এই হাসপাতালে প্রতিদিন কম-বেশি ৫০ নারী সন্তান জন্ম দেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশেরই স্বাভাবিক প্রসব হয়। বহির্বিভাগে প্রতিদিন সেবা নেন দুই হাজার রোগী।
দেশে প্রয়োজনের তুলনায় হাসপাতালের সংখ্যা অনেক কম। সেখানে ৭০০ শয্যার একটি হাসপাতাল বন্ধ হলে সেবার পরিধি আরও সংকুচিত হয়ে যায়— বলছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী। তিনি বললেন, ‘সরকার অস্থায়ীভাবে অধিগ্রহণ করে হলেও হাসপাতাল চালু রাখা দরকার। তা না হলে অন্তঃসত্ত্বা, কিডনি রোগীদের পাশাপাশি সব রোগীরই ভোগান্তি বাড়বে।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ততা যা আছে সময়সীমা বেঁধে সেগুলো পূর্ণ করতে সুযোগ দিতে হবে, যার তত্ত্বাবধানে থাকবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হাসপাতালে এখনো ২০ রোগী: হাসপাতালটির লাইসেন্স বন্ধের তিন দিনের মধ্যে রোগীদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নিতে বলা হলেও শারীরিক জটিলতা ও আর্থিক কারণে এখনো ২০ শিশু এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন। মুমূর্ষু এসব শিশুর বেশিরভাগই কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। এসব রোগীর কারেও শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত অবনতির দিকে। কেউ কেউ ভেন্টিলেশনে আছে। কারও কারও সামর্থ্য নেই অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা চালানোর।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের মানবসম্পদ বিভাগ ও কোম্পানি অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক তারিকুল ইসলাম মুকুল আগামীর সময়কে জানালেন, গত বুধবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স ফেরত চেয়ে আবেদন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সবদিক বিবেচনায় নিয়ে লাইসেন্স ফিরিয়ে দেবে— প্রত্যাশা তার।




