ঝটিকা মিছিল, বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ
ঢাকায় পুলিশের ২০০ তল্লাশি চৌকি
- দুই দিনে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ
- সতর্ক পুলিশ, নিরাপত্তা জোরদার
- গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ে দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন
- বাহিনীর মধ্যেই অপশক্তির ইন্ধন, রাখা হচ্ছে নজর
- আগাম তথ্য ও জনবল সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হঠাৎ করেই বেড়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল। ঢাকা জুড়ে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ আর বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে দুই দিন ধরে। এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়েও। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, আগাম গোয়েন্দা তথ্য না থাকা, বাহিনীর মধ্যে অপশক্তির ইন্ধন ও জনবল সংকটের কারণেই ঘটছে এসব ঘটনা। অবশ্য গতকাল শনিবার থেকে রাজধানীতে নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ। শহর জুড়ে বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বা তল্লাশি চৌকি।
গত শুক্রবার দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত রাজধানীতে ৮টি স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণ ও একটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গতকালও রাজধানীতে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, আগুন দেওয়া হয়েছে একাধিক বাসে। এসব ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে গুলশানে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করলেও আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা রুখতে বেগ পোহাতে হচ্ছে কেন?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম তথ্যের ঘাটতি ও পুলিশিং দুর্বলতার কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছেন। সরাসরি ও অনলাইনে গোপন বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন তারা। আগাম তথ্য না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না পুলিশ। আবার তথ্য পেলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া আছে বাহিনীর ভেতর থেকেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঘটনাও।
সম্প্রতি ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে যাতে কোনো মিছিল বা অপতৎপরতা চালাতে না পারেন, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট থানা এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং জোনের ডিসিকেই মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অপারেশনাল ঘাটতি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল-মিটিং বন্ধে পুলিশকে আগের মতোই তৎপর থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিষিদ্ধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কোনো মিছিল-মিটিং বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড যাতে না হতে পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কার্যক্রম ঠেকাতে শুধু থানার ওসি বা কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যথাযথ পদক্ষেপ নয়। এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই গোয়েন্দা তৎপরতা বা অন্যান্য বাহিনীর ব্যর্থতার দায় শুধু ওসির ওপর চাপিয়ে সাময়িক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অযৌক্তিক। প্রয়োজন গোয়েন্দা তৎপরতা আরও শক্তিশালী করা ও জনবল বৃদ্ধি করা।
রাজধানীর নিরাপত্তায় ২০০-এর অধিক চেকপোস্ট
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর নগর জুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করে ডিএমপি। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট। পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করছে। বাড়ানো হয়েছে পুলিশের টহলও। চেকপোস্টে সন্দেহজনক ব্যক্তি ও যানবাহন থামিয়ে তল্লাশির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন বললেন, নিরাপত্তা জোরদার করার অংশ হিসেবে রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর পাশাপাশি ঢাকা শহরের প্রধান প্রবেশদ্বারগুলোতে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক তৎপরতা প্রতিরোধে মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের সন্দেহজনক যানবাহনে নিবিড় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাজধানী জুড়ে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এ ছাড়া নগরীর নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো এবং পিকেট ডিউটি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে নগর জুড়ে থানা মোবাইল প্যাট্রল, ফুট প্যাট্রল ও হোন্ডা প্যাট্রলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো বড় ধরনের অপরাধ বা নাশকতা প্রতিরোধে মাঠে ডিবি টিম, সিটিটিসি টিম এবং এপিবিএন টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ডিএমপির এই কর্মকর্তা।
সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুলিশ কর্মকর্তাদেরও
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের তৎপরতা বন্ধে মাঠপর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে এই নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও শুরু হয়েছে। গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানের মিছিলকে কেন্দ্র করে ১৬ সেপ্টেম্বর গুলশান মডেল থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। একই দিন দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে। এক দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান সরদার নুরুল আমিনকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। সবশেষ গতকাল গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. সরোয়ার হোসাইনকেও বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ২৫ আগস্ট ময়মনসিংহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে একটি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বদলি করা হয়।
পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কোনো রাজনৈতিক সংগঠন আগাম ঘোষণা না দিয়ে হঠাৎ বড় মিছিল বের করলে অথবা আগাম তথ্য না পেলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আগাম গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশ প্রয়োজন অনুযায়ী আগে থেকেই মোতায়েন বাড়াতে পারে। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।’



