তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জন্য নতুন বিধিমালা
সরকারি নিয়োগে বাড়ছে মৌখিকের নম্বর
- দুর্নীতি স্বজনপ্রীতির শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি চাকরিতে তৃতীয় ও চতুর্থ (বেতন স্কেলের ১১-২০ গ্রেড) শ্রেণির নিয়োগে নতুন বিধিমালা আসছে। এক্ষেত্রে কমানো হচ্ছে লিখিত পরীক্ষার নম্বর। আর বাড়ানো হচ্ছে মৌখিকের। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি (ভুয়া) পরীক্ষার্থী ঠেকাতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে— জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দাবি। তবে এটি মানতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতেই মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হয়ে থাকে। এতে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হবে, বাড়বে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণ।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে ‘প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি’র বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বর্তমান বিধান অনুযায়ী, কারিগরি ছাড়া প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদের নিয়োগে লিখিত ৭০ ও মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ শতাংশ নম্বর নির্ধারণ করা আছে। সে অনুযায়ী প্রশাসনে এসব পদে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ হচ্ছে। এ স্তরে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৩ লাখ ২৪ হাজার ৩৪৩টি। আর নতুন বিধিমালায় ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য তিনটি স্তর রাখা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— ক. ১১-১২তম গ্রেডের কোনো পদে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষায় ১৫০ নম্বরের মধ্যে ৫০ নম্বর মৌখিক; বাকি ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় বাংলা ২৫, ইংরেজি ২৫, গণিত ২৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল/সাধারণ জ্ঞানে ২৫ নম্বর থাকবে। খ. ১৩-১৬তম গ্রেডে ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত ৬০ এবং মৌখিকে ৪০ নম্বর। এই স্তরে লিখিত পরীক্ষার নম্বর বিন্যাসে বাংলা ১৫, ইংরেজি ১৫, গণিত ১৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল/সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর রয়েছে এবং গ. ১৭-২০তম গ্রেডে মোট ৫০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত ২৫ এবং মৌখিকে ২৫ নম্বর রয়েছে। লিখিত ২৫ নম্বরের মধ্যে আছে বাংলা ১০, ইংরেজি ৫, গণিত ৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল/সাধারণ জ্ঞানে ৫।
এ ছাড়া কারিগরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে— কোনো প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে তাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হবে। এ দুই পরীক্ষায় পাস করার পরই তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। মৌখিক পরীক্ষায় পাস না করলে বিবেচিত হবেন না। তবে প্রস্তাবিত বিধিমালার শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং আনসার ব্যাটালিয়ন, কোস্ট গার্ড, র্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী কিংবা সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাভুক্ত কোনো পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা প্রণয়নের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে সচিব কমিটির জন্য পাঠানো সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এদের আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাসমূহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কার্যক্রমে কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী নিজে অংশগ্রহণ না করে নানারূপ অসদুপায় (প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার ইত্যাদি) অবলম্বন করে চাকরি লাভের চেষ্টা করছেন। ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি লাভের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।’
তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি বাড়বে— এমন বলে মন্তব্য করেছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অতীতেও বিসিএসের ক্ষেত্রে এটা করা হয়েছিল। ড. সা’দত হুসাইন পিএসসির চেয়ারম্যান হওয়ার পর বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ফের ২০০ নম্বর করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বরের এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনে বিসিএসের মৌখিকের নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে আবার ১০০ করা হয়, যা এখনো কার্যকর। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষা ২০ নম্বরের বদলে ১০ করা হয়েছিল।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বললেন, ‘পছন্দের লোক নিয়োগ দিতে সাধারণত মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হয়ে থাকে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বেশি মানেই দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া। এতে অদক্ষরা সরকারি চাকরিতে ঢুকবে।’
যদিও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে— ‘মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়; তাও নিশ্চিত করা হবে।’





