আর্থিক খাতে ৩৯ সংস্কারের অঙ্গীকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে আর্থিক খাতের ৮ নীতি বাস্তবায়নে ৩৯ ধরনের সংস্কার আনবে সরকার। আগামী তিন অর্থবছরে এগুলো করা হবে বলে অঙ্গীকার করা হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে গিয়েই এসব নীতি নেওয়া।
এগুলো হলো— রাজস্ব নীতি, মুদ্রানীতি, বিনিময় হার, বহিঃখাত নীতি, সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক খাত উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন এবং কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় এসব বিষয় উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাজেটে যেসব অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, সবার জন্য উন্নয়ন, সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা, সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ নির্ভর কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি। এছাড়া সাশ্রয়ী ও সহজ ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ এবং প্রাণ প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা। এসব পূরণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
রাজস্ব নীতি
এক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের অবস্থান হলো- আর্থিক শৃঙ্খলা ও রাজস্ব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রবৃদ্ধি সহায়ক উন্নয়ন ব্যয় সম্প্রসারণ। এছাড়া ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্য হলো- ঋণ ও ঘাটতির ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রেখে অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা। লক্ষ্য পূরণে যেসব সংস্কার আনা হবে সেগুলো হলো-অগ্রাধিকারভিত্তিক বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), কর সংস্কার, সরকারি ব্যয় যৌক্তিকীকরণ, লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির উন্নয়ন করা।
মুদ্রানীতি
এক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরের অবস্থান হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি বিরোধী শৃঙ্খলা বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে মুদ্রানীতি শিথিলকরণ। পরের দুই অর্থ বছরে লক্ষ্য রয়েছে, মূল্যস্ফীতি প্রশমিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধি সহায়ক মুদ্রা পরিস্থিতির দিকে ক্রমান্বয়ে উত্তরণ ঘটানো। এসব পূরণে সংস্কার করা হবে নীতি সুদহার ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ বাড়ানো, সুদহার করিডোর, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যস্ফীতি পর্যবেক্ষণ কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।
বহিঃখাত নীতি
আগামী অর্থবছরে এক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী করা এবং রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো। পরের দুই অর্থবছরে লক্ষ্য রয়েছে রপ্তানি বাণিজ্য বহুমুখীকরণ, বহিস্থ খাতের সহনশীলতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিতকরণ। এসব লক্ষ্য পূরণে সংস্কার আনা হবে বাণিজ্য সহজীকরণে, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, বাণিজ্য আলোচনা এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর ক্ষেত্রে।
বিনিয়ম হার নীতি
আগামী অর্থবছরে এক্ষেত্রে অবস্থান হচ্ছে, হস্তক্ষেপ সীমিতকরণের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারভিত্তিক বিনিয়ম হার ব্যবস্থা পরিচালনা করা। পরের দুই অর্থবছরে বহিঃখাতের উন্নয়ন এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিনিময় হারে অধিক গতিশীলতা আনা ও সুসংহতকরণ করা হবে। এসব লক্ষ্য পূরণে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার পর্যবেক্ষণ এবং রেমিটেন্সে প্রণোদনা দেওয়া হবে।
সামাজিক সুরক্ষানীতি
এক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরে সরকারের অবস্থান হলো, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষার জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচিগুলোর কৌশলগত সম্প্রসারণ করা। পরের দুই অর্থবছরের লক্ষ্য হচ্ছে, একটি সমন্বিত এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ব্যবস্থার পর্যায়ক্রমিক শক্তিশালীকরণ। এ লক্ষ্য পূরণে ফ্যামিলি কার্ড সম্প্রসারণ, কৃষক কার্ড সম্প্রসারণ, ওমএমএস কার্যক্রম বৃদ্ধি, ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি এবং ডিজিটাল জিটুপি পরিশোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
আর্থিক খাত সংস্কার
আগামী অর্থবছরে এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলা সুসংহতকরণ করা। পরের দুই অর্থবছরের লক্ষ্য হলো, আর্থিক মধ্যস্থতা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। এছাড়া উৎপাদনশীল খাতে ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। লক্ষ্য পূরণে সংস্কার করা হবে, ব্যাংকিং খাত তদারকি, খেলাপি ঋণ কমানো, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, পুঁজিবাজার উন্নয়ন, সুশাসন এবং সংস্কারমূলক বিধিবিধান তৈরি করা হবে।
বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ সংস্কার
আগামী অর্থবছরের জন্য এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান হলো- বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিতকরণ করা। পরের দুই অর্থবছরের জন্য লক্ষ্য হচ্ছে, বেসরকারি খাত চালিত প্রবৃদ্ধির পরিধি সম্প্রসারণ এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অবকাঠামো উন্নয়ন সুসংহতকরণ করা। লক্ষ্য পূরণে ওয়ানস্টপ বিনিয়োগকারী সেবা, পিপিপি অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, ইকনোমিক জোন উন্নয়ন, ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং ডিরেগুলেশন করা হবে।
কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
এক্ষেত্রে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের অবস্থান হচ্ছে, সুশাসন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিতকরণ। পরের ২০২৭-২৮ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের লক্ষ্য হলো, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহনশীলতা সুসংহত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো আরও গভীর করা। এসব লক্ষ্য পূরণে ডিজিটাল সুশাসন সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ, বিধিগত সংস্কার, অটোমেশন এবং নীতি সমন্বয় করা হবে।




