সংকটের ওপর সংকট, বিদ্যুৎ সমাধান দূরে

ছবি: এআই
দেড় মাসের বেশি সময় ধরে তীব্র গ্যাস সংকট আর এক মাস ধরে কয়লার অভাবে ব্যাহত বিদ্যুৎ উৎপাদন। সম্প্রতি কারিগরি ত্রুটির ফাঁদে পড়ে আদানিসহ দুটি কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনও নেমেছে অর্ধেকে। এর মধ্যেই তীব্র গরমে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু নানামুখী সংকটে এই চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে মানুষ, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিদ্যুতের অভাবে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ধাক্কা লেগেছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে।
গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও বিদ্যুতের লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছায়। আগের দিন যা ছাড়িয়ে যায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, কয়লা সংকটে এক মাসের বেশি সময় ধরে চাহিদামতো বিদ্যুৎ দিতে পারছিল না ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্র।
কয়লা সরবরাহ কিছুটা স্বাভাবিক হলে বুধবার সন্ধ্যায় ওই কেন্দ্রে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু সেই স্বস্তি টিকল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। রাত ১১টায় প্রায় ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট সরবরাহ করা অবস্থাতেই বন্ধ হয়ে যায় কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নামে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে বয়লার ফিড পাম্পে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সেটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওযার কারণে বাধ্য হয়ে ইউনিটটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে আদানি জানিয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, মেরামতের কাজ শুরুর আগে ইউনিটটিকে প্রথমে ঠান্ডা হতে দিতে হবে। সেজন্য অন্তত ৪৮ ঘণ্টা
সময় লাগবে। সব মিলিয়ে মেরামত কাজ শেষ হতে কয়েকদিন লাগবে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। গতকাল উৎপাদন হয়েছে ১৩ থেকে সাড়ে ১৩ হাজারের মতো। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সেখান থেকে গতকাল উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম।
এদিকে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে যে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা রাখার কথা, সেখানেও পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। দেশের সাতটি কয়লাকেন্দ্রের মোট সক্ষমতা ৬ হাজার ১৩৩ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে মিলছে গড়ে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট। কয়লা সংকটের কারণে পটুয়াখালীর আরএনপিএল কেন্দ্র ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াটের জায়গায় দিচ্ছে ৭০০ মেগাওয়াট।
কারিগরি ত্রুটির কারণে ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনও প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। এটি মেরামত করতে আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রটির কর্মকর্তারা।
বড়পুকুরিয়ার দুটি ইউনিটেও রয়েছে কারিগরি ত্রুটি। রামপালেও সম্প্রতি কয়লা সরবরাহ ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। তবে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে এখন প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
সংকট কাটাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। গ্যাস-কয়লার দ্বিমুখী সংকট সামলাতে সরকার এখন ঝুঁকছে সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিকল্পের দিকে— ফার্নেস অয়েল।
পিডিবি সেপ্টেম্বরে দৈনিক ৪ হাজার মেগাওয়াট তেলভিত্তিক বিদ্যুতের লক্ষ্যে চেয়েছে ২ লাখ টন ফার্নেস অয়েল, বিপরীতে বিপিসির সরবরাহ-উদ্যোগ মাত্র ১ লাখ ৩৬ হাজার টনের— অর্থাৎ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে।
এই তেল কিনতে অর্থ বিভাগ পিডিবিকে বরাদ্দ দিয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এরই মধ্যে বিতরণ হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেয়েছে সামিট গ্রুপ (৫৩৩ কোটি টাকা), এরপর ইউনাইটেড পাওয়ার (৪৩৩ কোটি টাকা)। তবে টাকা মিললেও তেল মেলা সহজ নয়— কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নিজেরাই আমদানির জন্য ঋণপত্র খুললেও সেই চালান দেশে পৌঁছাতে লাগবে আরও ১০-১৫ দিন।
আর এই বিকল্প জ্বালানিও এখন সস্তা নয়— গত বছর প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলের দাম যেখানে ছিল ৭১ টাকা, এখন তা প্রায় ১০০ টাকা। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেড়ে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। গতকাল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন হয়েছে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট।
এদিকে জ্বালানি সংকটের আঁচ পড়েছে সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অনেক বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় জ্বলছে না রান্নার চুলা। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোয় তৈরি হচ্ছে এক থেকে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ গাড়ির সারি— ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেয়ে অনেক অটোরিকশা নামতেই পারছে না রাস্তায়। এই দীর্ঘ লাইন কোথাও কোথাও তৈরি করছে যানজট, আর যাত্রীরা অভিযোগ করছেন অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের।
তীব্র গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। ফ্যান-এসি বন্ধ থাকছে, পানির পাম্প চালানো যাচ্ছে না, ব্যাহত হচ্ছে মোবাইল-ইন্টারনেট সেবাও। হাসপাতাল ও জরুরি সেবায় ব্যাকআপ জেনারেটরে কাজ চালানো গেলেও তাতে বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ— ঘরে থাকাও যেমন কষ্টকর, বাইরে বের হলেও মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরিবহন এবং জ্বালানি সংকটের।
শিল্প খাতে এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত-রড এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে কমেছে উৎপাদন। টেক্সটাইল মিলে সুতা উৎপাদন ও ডাইং প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটছে, সিরামিক কারখানায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় কিলন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজেল-ফার্নেস অয়েলচালিত জেনারেটরের শরণাপন্ন হচ্ছে, যাতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় এবং তৈরি হচ্ছে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি।
এদিকে দেশের বিদ্যুৎ-গ্যাসের সমস্যা নিয়ে শুরুতেই সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার। এ প্রসঙ্গে গতকাল এক ব্রিফিংয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, চাইলেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। কারণ নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে।



