বিশ্ব পোডিয়াট্রি দিবস আজ
পায়ের নিচে যে বিপদ, টের পান না অনেকেই

প্রতীকী ছবি
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ জুতার ভেতর ছোট একটি কাঁকর ঢুকে গেল। অস্বস্তি লাগল, কিন্তু ব্যথা হলো না। তাই জুতা খুলে পা দেখার প্রয়োজনও মনে হলো না। দিনের পর দিন এভাবেই চলতে থাকল। একসময় পায়ের তলায় ছোট্ট একটি ক্ষত তৈরি হলো। তবুও ব্যথা নেই। কয়েক দিন পর ক্ষতটি গভীর হলো, শুরু হলো সংক্রমণ। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর জানা গেল, পায়ের স্নায়ুর অনুভূতি কমে যাওয়ায় ক্ষত তৈরির সময় ব্যথাই অনুভব করেননি তিনি।
এটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বহু মানুষের জন্য এমন ঘটনা বাস্তবতার অংশ। বিপদটা অনেক সময় শুরু হয় খুব ছোট একটি ক্ষত দিয়ে, কিন্তু অসচেতনতা ও অবহেলায় সেটিই পরিণত হতে পারে আলসার, সংক্রমণ এমনকি গ্যাংগ্রিনে।
আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক পোডিয়াট্রি দিবস। পা ও গোড়ালির স্বাস্থ্য, পায়ের রোগ প্রতিরোধ এবং পায়ের বিশেষায়িত চিকিৎসার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পা শরীরের এমন একটি অংশ, যার ওপর ভর করে প্রতিদিন হাজার হাজার পদক্ষেপ ফেলেন মানুষ। অথচ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো নিয়মিতভাবে পায়ের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অভ্যাস এখনো অনেকের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, একজন ডায়াবেটিস রোগীর জীবনে পায়ের আলসার হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। একবার আলসার তৈরি হয়ে সংক্রমিত হলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে ১৬টি কেন্দ্রে ১ হাজার ২০০ জন টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৪৪ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীর ডায়াবেটিক ফুট আলসারের ঝুঁকি রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের রোগীদের ঝুঁকি ছিল শহরের তুলনায় বেশি। গবেষকেরা এ ক্ষেত্রে নিয়মিত পা পরীক্ষা বা স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কেন এত ঝুঁকি?
ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে পায়ে কাটা, ফোসকা, পোড়া কিংবা জুতার ঘর্ষণ থেকে ক্ষত তৈরি হলেও রোগী অনেক সময় তা টের পান না। একই সঙ্গে রক্ত চলাচলে সমস্যা থাকলে ক্ষত শুকাতেও দেরি হয়।
পায়ের তলায় কোথায় কতটা চাপ পড়ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটার সময় একই জায়গায় বারবার অতিরিক্ত চাপ পড়তে থাকলে সেখানে শক্ত চামড়া, ফোসকা কিংবা ক্ষত তৈরি হতে পারে। জুতা, হাঁটার ধরন, হাঁটার দূরত্ব এবং পায়ের তলায় অতিরিক্ত চাপ—সবই ডায়াবেটিক ফুট আলসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় উঠে এসেছে ১১৩ জন ডায়াবেটিক ফুট আলসার রোগীর ওপর করা গবেষণায় ৯৩ দশমিক ৯১ শতাংশ রোগীর পায়ের যত্নে অবহেলার তথ্য পাওয়া যায় এবং প্রায় ৮৬ শতাংশের আলসার ছিল গুরুতর পর্যায়ের।
অর্থাৎ বিপদটা অনেক সময় শুরু হয় খুব ছোট জায়গা থেকে—একটি ফোসকা, সামান্য ঘর্ষণ কিংবা পায়ের তলায় ছোট একটি ক্ষত। কিন্তু সেটিকে অবহেলা করলে ক্ষত গভীর হতে পারে।
সংক্রমণ হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১০৬ জন ডায়াবেটিক ফুট আলসার রোগীর ওপর করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ৮১ দশমিক ১ শতাংশ রোগীর ক্ষতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ পাওয়া গেছে।
পায়ের চাপও জানাতে পারে বিপদের কথা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী বলেন, ডায়াবেটিস রোগীদের পায়ের আলসার ও গ্যাংগ্রিনের ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করতে পায়ের চাপ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তার মতে, দেশে বিপুলসংখ্যক ডায়াবেটিস রোগী পায়ের বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকিতে থাকলেও অনেকে আলসার বা গ্যাংগ্রিন হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে আসেন। এতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পায়ের অংশবিশেষ বা পুরো পা কেটে ফেলতে হয়।
আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক যন্ত্রের মাধ্যমে পায়ের তলায় হাঁটার সময় কোথায় অতিরিক্ত চাপ পড়ছে, তা শনাক্ত করা সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে চাপ কমাতে বিশেষভাবে তৈরি জুতাও ব্যবহার করা যায়। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান রিলেভেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সোসাইটি, বাংলাদেশ দেশে তৈরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশ পোডিয়াট্রি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ডা. মোর্শেদ উদ্দীন আকন্দ বলেন, বাংলাদেশে পোডিয়াট্রি এখনো নতুন একটি বিষয়। অথচ মানুষের স্বাভাবিক ও সুস্থভাবে চলাফেরার জন্য পায়ের সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিসের কারণে পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ছোট ক্ষতও ধীরে ধীরে সংক্রমণ, গ্যাংগ্রিনসহ গুরুতর সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
তিনি বলেন, পায়ের সমস্যা শুরু হওয়ার পর দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত পা পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষায়িত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পায়ের যত্নের শুরুটা খুব সাধারণ কিছু অভ্যাস থেকেই হতে পারে। প্রতিদিন পা দেখে নেওয়া, বিশেষ করে পায়ের তলায় কোনো ক্ষত, ফোসকা, লালচে দাগ বা ফোলা আছে কি না পরীক্ষা করা; উপযুক্ত মাপের জুতা পরা; খালি পায়ে হাঁটা এড়িয়ে চলা এবং ডায়াবেটিস থাকলে নিয়মিত পা পরীক্ষা করানো—এসব অভ্যাস বড় বিপদ ঠেকাতে পারে।



