ডলফিন-তিমির মৃত্যু অজানাই রয়ে যায়
- ২০২৩ সাল থেকে গত জুন পর্যন্ত উপকূলে অন্তত ৫০টি বড় সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে এসেছে
- ময়নাতদন্ত ছাড়াই মাটিচাপা
- মৃত্যুর কারণ নিয়ে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ বা গবেষণা নেই

একটির পর একটি মৃত ডলফিন ও তিমি ভেসে আসছে বাংলাদেশের উপকূলে। কখনো সমুদ্রসৈকতে, কখনো নদীর মোহনায়। কিন্তু মৃত্যুর কারণ খুঁজে বের করার আগেই সেগুলো মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। ফলে কেন বারবার মারা যাচ্ছে এই সামুদ্রিক প্রাণীগুলো, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা অজানা থেকে যাচ্ছে। পরিবেশকর্মী ও গবেষকদের মতে, প্রতিটি মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত না হওয়ায় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তাও অদেখা থেকে যাচ্ছে।
গত ২৯ জুন পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের কাউয়ারচর এলাকায় ৫৬ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি মৃত বেলিন তিমি ভেসে আসে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ৩ জুন একই সৈকত থেকে আরও একটি ৫৮ ফুট লম্বা মৃত বেলিন তিমি উদ্ধার করা হয়।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত উপকূলে অন্তত ৫০টি বড় সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫০টির বেশি ডলফিন ও অন্তত পাঁচটি তিমি। একটি তিমি জীবিত অবস্থায় তীরে এলেও পরে মারা যায়।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ও ডলফিন রক্ষা কমিটির সদস্য আবুল হোসেন রাজু বলেছেন, ২০১৮ সাল থেকে তারা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে সামুদ্রিক প্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছেন। মাঠপর্যায়ে জেলেদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, অনেক ডলফিন মাছ ধরার জালে আটকে মারা যায়। অনেক ক্ষেত্রে জেলেরা জীবিত ডলফিনকে ছেড়ে না দিয়ে অবহেলায় মরতে দেন। কিছু জেলের মধ্যে এমন কুসংস্কারও রয়েছে যে, ডলফিন জালের কাছে এলে মাছ কম ধরা পড়ে। এ কারণে কেউ কেউ ডলফিনকে তাড়িয়ে দেন, এমনকি আঘাতও করেন।
তার মতে, প্লাস্টিক বর্জ্য ও সমুদ্রে ভাসমান ছেঁড়া জালও ডলফিনের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এসব জাল মুখ বা লেজে জড়িয়ে গেলে তারা স্বাভাবিকভাবে চলাচল, শিকার কিংবা শ্বাস নিতে পারে না। এ ছাড়া বিষাক্ত শৈবালের বিস্তার, দূষণ, বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা এবং বড় জাহাজের ধাক্কাও মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
রাজুর অভিযোগ, প্রতিটি মৃত ডলফিন উদ্ধারের পর প্রশাসনের কাছে ময়নাতদন্তের অনুরোধ জানানো হলেও আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। অথচ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা গেলে সে অনুযায়ী সংরক্ষণ পরিকল্পনা ও জেলেদের সচেতন করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতো।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওসানোগ্রাফি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল হাসান বললেন, উপকূলে মৃত ডলফিন, তিমি, কচ্ছপ ও জেলিফিশ ভেসে আসার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; এগুলো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ইঙ্গিত।
তার ভাষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং কচ্ছপের সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ডলফিন ও তিমির মৃত্যুর প্রধান কারণ মানুষের কর্মকাণ্ড। মাছ ধরার জালে আটকে পড়া, জাহাজ ও ট্রলারের ধাক্কা এবং অসচেতন আচরণে এসব প্রাণী মারা যাচ্ছে।
তিনি বলেছেন, ডলফিন ও তিমি সমুদ্রের ‘বায়োলজিক্যাল ইন্ডিকেটর’। অর্থাৎ, সমুদ্রের পরিবেশ কতটা সুস্থ, তা এদের উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়। এরা খাদ্যশৃঙ্খলের সর্বোচ্চ স্তরের প্রাণী। তাই এদের সংখ্যা কমে গেলে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মৎস্যসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তার মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব মৃত্যুর কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য দেশে কার্যকর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। ব্লু ইকোনমির সুফল পেতে হলে সামুদ্রিক প্রাণী ও তাদের আবাসস্থল রক্ষায় গবেষণা, নজরদারি এবং বৈজ্ঞানিক তদন্তকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
এদিকে মহিপুর বন বিভাগের ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেছেন, খবর পেলে বন বিভাগ মৃত প্রাণী উদ্ধার করে। কখনো বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষ নমুনা চাইলে তা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়। তবে জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে নিয়মিত ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয় না।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বললেন, আগে এ বিষয়ে একটি প্রকল্পের আওতায় কাজ হলেও বর্তমানে তা নেই। ফলে মৃত্যুর কারণ নিয়ে তাদের নিজস্ব কোনো পর্যবেক্ষণ বা গবেষণা নেই।




