মিনি স্টেডিয়ামে বড় গলদ
- সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প নেওয়ায় মাঝ পথে নানা জটিলতা
- ১৬৪৯ কোটি থেকে এক লাফে ব্যয় বেড়ে ২৮৫৫ কোটি টাকা
- মেয়াদ বাড়লেও কাজের গতি মন্থর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের বিভিন্ন উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম তৈরির প্রকল্পের গোড়ায় ছিল বড় গলদ। অর্থাৎ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা না করেই নেওয়া হয়েছিল এ প্রকল্প। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। যদিও প্রকল্প নেওয়ার পর করা হয়েছিল একটি সমীক্ষা। তবুও বাস্তবায়ন পর্যায়ে নানা জটিলতায় বিরাজ করছে মন্থর গতি।
এদিকে এক লাফে ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ, আর মেয়াদও বেড়েছে দুই বছর। কিন্তু গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৫ বছরের প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৭ শতাংশ। খরচ হয়েছে ৮২০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এ অবস্থায় বর্ধিত ব্যয় ও মেয়াদেও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বেশি টাকার একটি প্রকল্প কীভাবে সমীক্ষা ছাড়া নেওয়া হয়েছিল, তা অবাক করা মতো বিষয়। এটি অবশ্যই সবার গাফিলতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পরিকল্পনা কমিশনও এর দায় এড়াতে পারে না।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রফিক সাকি আগামীর সময়কে বলেছেন, জনগণের করের টাকার অপচয় কারও কাম্য নয়। প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। আগামীতে যাতে প্রকল্পের এমন অবস্থা না হয় সেজন্য নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আইএমইডি যেসব সুপারিশ দেবে সেগুলো যাতে কার্যকর হয় সেজন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, সমীক্ষা ছাড়া হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া কাম্য নয় কোনোভাবেই।
প্রকল্প নিয়ে তৈরি করা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে আগামী ৩০ জুন।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা অডিট অধিদপ্তরের উত্থাপিত আপত্তি সংখ্যা চারটি। উত্থাপিত এসব আপত্তিতে মোট ৪ কোটি ৭৭ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬২ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে ব্রডশিট আকারে জবাব নিরীক্ষিত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দেরি এবং তথ্য সরবরাহে ঘাটতি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা বাড়ায়।
আইএমইডি সূত্র জানায়, উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযোগী অবকাঠামো সৃষ্টি, তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য হাতে নেওয়া হয় প্রকল্পটি। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ‘উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ-২য় পর্যায়’ নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালের ৪ মে এটির অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এটির মূল ব্যয় ছিল ১ হাজার ৬৪৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। পরে বাস্তবতা বিবেচনায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২ হাজার ৮৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
এদিকে প্রকল্পের অনুমোদিত মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে করা হয় ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। এতে ব্যয় ৭৩ দশমিক ১৩ এবং মেয়াদ ৫০ শতাংশ বেড়েছে। চলমান প্রকল্পটি দেশের ৫৮টি জেলার ২০১টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আইএমইডি বলছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি সমস্যা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ ছাড়াই দরপত্র আহ্বান ও ঠিকাদার নিয়োগ, বাস্তবায়নের সময় নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, খাস জমি হস্তান্তর, মালিকানা যাচাই, প্রশাসনিক অনুমোদন, দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দিতে দেরি হওয়ায় বাস্তবায়ন দেরি হচ্ছে। মূল ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) ১৮৬টি উপজেলা ছিল। কিন্তু সংশোধিত প্রকল্পে তা বাড়িয়ে ২০১টি করা হয়। সেই সঙ্গে আরও অনেক কাজ যুক্ত করা হয় প্রকল্পের মাঝপথে।
আরও বলা হয়েছে, ক্রয় কার্যক্রম ও বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা তৈরি বিধি অনুযায়ী হলেও অধিকাংশ প্যাকেজে সময়সূচি অনুযায়ী অগ্রগতি হয়নি। নির্মাণ কাজের গুণগতমান সন্তোষজনক হলেও নির্মাণাধীন কয়েকটি কাজের কিউরিংয়ের ঘাটতি, অসমতল মাঠ ও ঘাসের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সীমানা প্রাচীর ও প্রবেশদ্বার না থাকা, প্যাভিলিয়ন চেয়ারের সংযোগ যথাযথ না হওয়া এবং ফিনিশিং ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত বিভিন্ন ত্রুটি পাওয়া গেছে। আরও আছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জনবল ঘাটতি, পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক না থাকা এবং পিএসসি/পিআইসি সভা নিয়মিত না হওয়া।
প্রকল্পের দুর্বল দিক সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ণকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক না থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রমে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অবকাঠামোগত নকশা ও ডিজাইন বারবার পরিবর্তনের কারণে বেড়েছে কাজের সময় ও ব্যয়। পাশাপাশি বাস্তবায়ন কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে সমন্বয়হীনতা। অনুমোদিত জনবলের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব নির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে, যা প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রমের কমিয়েছে দক্ষতা। পূর্ণাঙ্গ ও টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো না থাকায় ভবিষ্যতে অবকাঠামোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ পড়তে পারে ঝুঁকির মুখে।
প্রকল্পের অন্য ঝুঁকিগুলো হলো— রেট শিডিউল পরিবর্তনের কারণে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি। যা প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সৃষ্টি করতে পারে চাপ। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি এবং ব্যয় বৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সঙ্গে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ধীরগতি বা গাফিলতির কারণে কাজের মান ও সময়মতো বাস্তবায়ন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভূমিকম্প ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য নির্মাণ কাজ হতে পারে বাধাগ্রস্ত।




