রপ্তানি বাড়াতে কার্যকর কৌশল দরকার

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
চীনের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের ১০০ শতাংশ শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ সুবিধার পূর্ণ সুফল আমরা কতখানি ঘরে তুলতে পেরেছি? বাস্তব চিত্র বলছে, আমরা এখনো এর কাঙ্ক্ষিত সুফল নিতে পারিনি। কারণ শুধু শুল্ক কমানো বা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার মাধ্যমেই রপ্তানি বৃদ্ধি পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পণ্যের মান, চীনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, উৎসের বিধি, সরবরাহ সক্ষমতা এবং বাজারে কার্যকর প্রবেশের কৌশল।
বর্তমানে চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর। চীন থেকে আমরা বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কাপড়, রাসায়নিক ও শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ আমদানি করি। অন্যদিকে, আমাদের রপ্তানির ঝুড়িটি তুলনামূলক অনেকটাই ছোট। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, চীনের এই শুল্কমুক্ত সুবিধাকে কার্যকর রপ্তানি বৃদ্ধিতে রূপান্তর করা। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমাদের প্রথাগত তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিজাত প্রক্রিয়াজাত পণ্য, মৎস্য এবং জলজ পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া এবং জুতা, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে।
বিশেষ করে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের জন্য এক দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশে এরই মধ্যে পণ্য সংযোজন, উৎপাদন, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, প্রযুক্তিগত সমাধান এবং বিক্রয়োত্তর সেবার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। আমাদের চিন্তা করতে হবে ভিন্নভাবে— চীন থেকে শুধু তৈরি পণ্য আমদানি না করে সেখানকার কাঁচামাল ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন করতে হবে এবং তা চীনে ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিপণ্য, মৎস্য ও জলজপণ্য চীনের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও চীনের শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনায় এসব পণ্যের দ্রুত বাজার প্রবেশের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কিন্তু পচনশীল এসব পণ্যের বাজার ধরতে এবং পরিবহন ব্যয় কমাতে শুধু উড়োজাহাজ ভাড়ার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এর জন্য দরকার উন্নত শীতল সংরক্ষণব্যবস্থা, দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র, বিমানবন্দরে বিশেষ পদ্ধতিতে কৃষিপণ্য ব্যবস্থাপনা এবং ডেডিকেটেড করিডর ব্যবস্থা।
চীনের বাণিজ্যিক হাব কুনমিং কিংবা অন্যান্য বাণিজ্যকেন্দ্রে বাংলাদেশ থেকে স্থায়ী গুদাম বা প্রদর্শনী কেন্দ্র তৈরি করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। তবে স্থায়ী প্রদর্শনীর সঙ্গে যদি বিক্রি, ডিস্ট্রিবিউটর নেটওয়ার্ক, লজিস্টিকস এবং আফটার-সেলস সার্ভিস না থাকে, তবে তা পূর্ণাঙ্গ ফল দেবে না।
বর্তমানে চীনে আমাদের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা যেমন একদিকে সুবিধাজনক, অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকির কারণও হতে পারে। এই ঝুঁকি কমাতে আমাদের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে স্থাপিত চীনা কারখানাগুলোতে স্থানীয় সরবরাহকারী হিসেবে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে কাঁচামাল, যন্ত্রপাতির অংশ, প্যাকেজিং এবং লজিস্টিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে যুক্ত করতে হবে।
পাশাপাশি চীনের ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-এর উপাদান— যেমন অটোমেশন, রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে আমাদের কাজে লাগানো উচিত। এর জন্য প্রয়োজন যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণা। চীনের প্রযুক্তি ও অর্থায়নের সঙ্গে আমাদের দেশের উদীয়মান এবং শ্রমদক্ষ তরুণদের যুক্ত করতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটি বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ব্যবসা সহজীকরণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লেনদেনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ইউয়ান ব্যাংকিং ও সীমান্ত-পারাপার লেনদেনের অনুমতি দিয়েছে। এটি ডলারনির্ভরতা ও মুদ্রা বিনিময়ের খরচ কমাবে। তবে এর কার্যকর সুফল পেতে ব্যাংকগুলোর ইউয়ান লেনদেনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আসন্ন স্বল্পোন্নত দেশ উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চীনে টিকে থাকতে হলে পণ্যের মান, পরিবেশগত মানদণ্ড, শ্রমমান এবং ট্রেসেবিলিটি জোরদার করতেই হবে। আগামী দিনে কম দাম দিয়ে বাজার ধরা যাবে না, গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্যতাই হবে প্রধান শর্ত।
সর্বোপরি, ২০২৬ ও তৎপরবর্তী সময়ের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব শুধু ‘কেনাবেচা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একটি সমন্বিত, স্বচ্ছ ও দীর্ঘমেয়াদি ‘যৌথ অ্যাকশনপ্ল্যান’-এর মাধ্যমে প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গবেষণা ও উৎপাদনকে যুক্ত করে টেকসই যৌথ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে— চীনকে শুধু পণ্য কেনার দেশ না ভেবে, প্রযুক্তি শেখার এবং নিজেদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার একটি বিশাল সুযোগ হিসেবে দেখুন।
লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড এবং সভাপতি, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি)



