শিক্ষক বদলিতে ভাঙছে ‘সচিবালয় সিন্ডিকেট’
- প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নতুন নীতিমালা
- তদবিরের চাপে কাজ করা যায় না: শিক্ষামন্ত্রী
- ‘আশিক’-এর মডেলে হবে বদলি, সিদ্ধান্ত আসবে ৩ ধাপে
- প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক অঞ্চলে সহযোগী অধ্যাপক মাউশিতে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিক্ষা ক্যাডারে বদলিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার। মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক একক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে তিন স্তরে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে বদলির ক্ষমতা। নতুন নীতিমালায় প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের বদলি হবে ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে, সহযোগী অধ্যাপকদের বদলি দেখবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং সংস্থা, দপ্তর, অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ মহানগর ও সিটি করপোরেশন এলাকার পদায়নের ক্ষমতা থাকবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে। বদলিতে এই বিকেন্দ্রীকরণ কার্যকর হলে শিক্ষক বদলিতে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক পদায়ন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বহু বছরের তদবির নির্ভর সংস্কৃতিরও অবসান ঘটবে— এমনটি আশা খাতসংশ্লিষ্টদের।
ক্যাডার সার্ভিসের সংখ্যার দিকে সর্ববৃহৎ হলো শিক্ষা ক্যাডার। দেশের ৩৭৭টি কলেজে কর্মরত ১৬ হাজারের বেশি ক্যাডার শিক্ষক। তাদের মধ্যে সারা দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন ২০০-এর বেশি আবেদন আসে, শতাধিক বদলি প্রার্থী ভিড় জমান সচিবালয়ে। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে— এমন অভিযোগ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের। সেই সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী এক শ্রেণির দালাল তৈরি হয়েছে, যারা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বদলি করিয়ে দেন। এমন বার্তা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছার পর শিক্ষক বদলিতে ‘আঞ্চলিক শিক্ষা কমিটি (আশিক) মডেল’ অনুসরণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী (হয়রানি কমাতে ২০০১-০৬ বিএনপির সময়কালে হয় মডেলটি)। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর নতুন নীতিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে মন্ত্রণালয়। সেই নীতিমালা অনুযায়ী অঞ্চল, মাউশি অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়— এই তিন স্তরে সম্পন্ন হবে বদলি কার্যক্রম। এতে বদলি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম বন্ধ হয়ে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক পদায়ন নিশ্চিতের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত দাপ্তরিক চাপ কমবে— এমনটাও আশা করছেন তারা।
বদলি প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন গতকাল আগামীর সময়কে বললেন, ‘বদলি করা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত কাজ হতে পারে না। প্রতিদিন বদলির পেছনে প্রচুর সময় দিতে হয়। তদবিরের চাপে আমরা নীতিনির্ধারণী প্রধান কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারি না। এজন্যই বদলিকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে এবং তিনটি পৃথক ধাপে এই বদলি সম্পন্ন হবে।’
ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরাও আশিক মডেলটিকে ইতিবাচক বলছেন। তাদের ভাষ্য, এটি নতুন নয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সময় আশিক মডেল এর মাধ্যমে প্রভাষক পদের বদলি কার্যক্রম স্বচ্ছতার সঙ্গে হতো। ওই সময়ে মাউশির পৃথক কোনো আঞ্চলিক অফিস না থাকলেও কমিটি খুবই শক্তিশালী ছিল। বর্তমানে সারা দেশে ৯টি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে উল্লেখ করে ওই শিক্ষকরা বলছেন, যেখানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৯ জন পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়। ফলে স্থানীয় কলেজের চাহিদা ও বদলি হতে আগ্রহী শিক্ষকের যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে বদলির সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তারা।
যেভাবে কাজ করবে তিন স্তরের বদলি কমিটি
গতকাল মন্ত্রণালয় থেকে নতুন বদলি নীতিমালার একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে— এমনটি জানালেন কলেজ শাখার কর্মকর্তারা। নীতিমালা অনুযায়ী, বদলির আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে পদমর্যাদা ও কর্মস্থল ভেদে তিনটি পৃথক কমিটির মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। সরকারি কলেজের প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকরা নিজ নিজ অঞ্চলের বদলির জন্য আবেদন করবেন। অঞ্চলের কমিটি সেই আবেদন যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মাউশি পরিচালক কমিটির সভাপতি এবং সহকারী পরিচালক (কলেজ) সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। কমিটিতে সদস্য হিসেবে থাকবেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক এবং জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি)।
ঢাকা মহানগরী এবং বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থার পদ ছাড়া সারা দেশে কর্মরত সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের শিক্ষকদের বদলি আবেদন নিষ্পত্তি করবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কমিটি। মাউশির মহাপরিচালক কমিটির সভাপতি এবং উপপরিচালক (কলেজ-১) সদস্য সচিব হবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (কলেজ-২) এবং মাউশির সহকারী পরিচালক (কলেজ)।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি কাজ করবে। তারা বিভিন্ন সংস্থা, দপ্তরের পদের বদলি-পদায়ন সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ ছাড়া অধ্যাপক, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সিটি করপোরেশন ও মহানগরীতে পদায়নের সিদ্ধান্তও নেবে এই কমিটি। কমিটিতে উপসচিব (কলেজ-১ অথবা ২) সদস্য সচিব থাকবেন। সদস্য হিসেবে থাকবেন কলেজ অনুশাখার অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক আগামীর সময়কে জানালেন, বদলি একজন শিক্ষকের চাকরিগত মৌলিক অধিকার। কিন্তু এতদিন একটি সাধারণ বদলির জন্য শিক্ষকদের দূরদূরান্ত থেকে মন্ত্রণালয়ে ছুটে আসতে হতো। এতে শিক্ষকরা ব্যাপক ভোগান্তির শিকার হতেন, আমাদেরও দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত হতো। তাই বদলির সিদ্ধান্তগুলো অঞ্চল ও অধিদপ্তর পর্যায়ে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে।
আঞ্চলিক শিক্ষা কমিটি বা আশিকের বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক ও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল আগামীর সময়কে বললেন, ‘৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ে শিক্ষা ক্যাডারের পরিচালক পদে কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকেন। তারা মাঠপর্যায়ের কলেজের আসল শূন্যপদ ও শিক্ষকদের বাস্তবতা সরাসরি মূল্যায়ন করতে পারবেন। ফলে কোন কলেজে কোন শিক্ষককে পদায়ন করলে ভালো হবে, সেটি তারাই ভালো মূল্যায়ন করতে পারবেন।’
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব ড. মাসুদ খান রানার ভাষ্য, অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মন্ত্রণালয় থেকে বদলি বিকেন্দ্রীকরণ করার। অবশেষ সরকার সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এজন্য সাধুবাদ জানাই। তবে আঞ্চলিক পর্যায়ে বদলিতে যেন হয়রানি ও বাণিজ্য না হয়, সেজন্য কঠোর তদারকি করতে হবে। স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায় নিশ্চিত করতে হবে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার আগামীর সময়কে বললেন, ‘খুবই ভালো সিদ্ধান্ত। তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কালো থাবা এড়াতে কমিটিকে ব্যাপক ক্ষমতা দিতে হবে। একই সঙ্গে কমিটিতে যেন বদলিতে বাণিজ্যের মতো দুর্নীতি জড়িত হতে না পারে, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে হবে।’
এর আগে বদলি বাণিজ্য ও হয়রানি বন্ধ করতে ২০২৫ সালে অনলাইনে বদলি করার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সময় সংশ্লিষ্টদের অনলাইনে বদলির আবেদন করতে বলা হয়। অনলাইন ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে পাঠানো বা পেশ করা আবেদন বিবেচনা করা হবে না বলা হয়। মাসখানেক কিছু বদলি অনলাইন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হলেও শেষ পর্যন্ত তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।




