যাত্রী কল্যাণ সমিতি
যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে প্রাণঘাতী বাংলাদেশের সড়ক!
- ১৩ বছরে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি নিভে গেছে প্রাণ

প্রতীকী ছবি
দেশে গত ১৩ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
সংগঠনটির দাবি, ইউক্রেন-রাশিয়া ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও যুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যাকেও ছাড়িয়েছে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির চিত্র।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়।
সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীর দাবি, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা উপেক্ষা করে সড়ককেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং রেল ও নৌপথের ব্যবহার সংকুচিত করায় দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে।
‘স্বাধীনতার আগে দেশের প্রধান যাতায়াতমাধ্যম ছিল নৌপথ। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল রেলপথ। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী এ দুই মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ যাতায়াত করতেন। সড়কে যাতায়াত করতেন মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ। সে সময় সড়ক দুর্ঘটনার হারও তুলনামূলকভাবে কম ছিল’— উল্লেখ করেন মোজাম্মেল।
বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধে প্রাণহানির চিত্র
২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে কয়েক বছর ধরে চলা সংঘাতে ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দীর্ঘ সংঘাতের পাশাপাশি রোগ, ক্ষুধা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাবে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধে সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে আনুমানিক ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় ৯ লাখ থেকে ১১ লাখ যোদ্ধা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
১৯১৭ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে সংঘটিত রুশ গৃহযুদ্ধেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে নিহত হন প্রায় ১০ লাখ মানুষ।
অন্যদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণা ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হিসাবে যুদ্ধে রাশিয়ার প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার সেনা এবং ইউক্রেনের ১ লাখ থেকে ২ লাখ সেনা নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধে গাজায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি।
অতীতের সব সরকার দায়ী
স্বাধীনতার পর উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে রেল ও নৌপথের পরিবর্তে সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে মানুষের যাতায়াত সড়কনির্ভর হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার দুর্নীতি, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারার কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বেড়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী অতীতের সব সরকার বলে মন্তব্য করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সড়ক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও কিছু পুলিশ কর্মকর্তার চাঁদাবাজির কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়েছে। এর পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, লাইসেন্সবিহীন ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, বেপরোয়া গতি এবং অযোগ্য চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার মতো সমস্যাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
সংগঠনটি বলছে, তাদের পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে। দেশের হাসপাতালগুলোর তথ্য বিবেচনায় নিলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সংগঠনটির মতে, স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন খাতে অগ্রগতি হলেও পরিবহন খাতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব রয়ে গেছে। নিরাপদ রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর পরিবর্তে সড়ক সম্প্রসারণ এবং সড়ক খাতে বিনিয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ সেই তুলনায় গণপরিবহনব্যবস্থা, গণপরিবহনের জন্য পৃথক বাস নেটওয়ার্ক এবং আধুনিক গণপরিবহনসেবা গড়ে ওঠেনি।
এ সুযোগে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন-করিমন এবং বিভিন্ন ধরনের ছোট যানবাহন যাত্রী পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে সড়কে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।
যেসব কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ও চলাচল। এ ছাড়া সড়কে বিভাজক না থাকা, গাছপালার কারণে দৃষ্টিসীমা বাধাগ্রস্ত হওয়া, মহাসড়ক নির্মাণে ত্রুটি, যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাও দুর্ঘটনার কারণ।
সংগঠনটি আরও বলছে, উল্টো পথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া চালকদের বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়াও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
দুর্ঘটনা কমাতে ১০ সুপারিশ
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ১০ দফা সুপারিশ করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা এবং উন্নত বিশ্বের আদলে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
এ ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ভিত্তিতে লাইসেন্স প্রদান, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ এবং সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
সুপারিশের অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, পথচারী পারাপারের নিরাপদব্যবস্থা, সড়কে পর্যাপ্ত নির্দেশক ও চিহ্ন স্থাপন, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত এবং নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা।
পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেওয়ার পদ্ধতি আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন চলাচল থেকে সরিয়ে নেওয়া, বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো এবং চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাফিক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।





