বাঁচতে এসে শিকারির ফাঁদে অতিথি পাখি

অতিথি পাখি। ছবি: কোলাজ
প্রকৃতিতে এখন হেমন্তকাল। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে শীত। এ সময় বিশ্বের শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোতে তুষারপাত ও খাদ্যসংকটের কারণে পাখিদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। প্রতিকূল পরিবেশ থেকে বাঁচতে খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এসব পাখি আসে বাংলাদেশে। নদী, বিল ও জলাভূমিতে খুঁজে নেয় বেঁচে থাকার আশ্রয়।
কিন্তু শীতের এই অতিথিরা বাংলাদেশেও নিরাপদ নয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি ফাঁদ, জাল ও বিষটোপ ব্যবহার করে নির্বিচারে শিকার করা হচ্ছে এসব অতিথি পাখিদের। পরে এসব পাখি বিক্রি করা হয় বিভিন্ন বাজারে। কোথাও কোথাও গোপনে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে শিকার করা পাখি। শুধু পরিযায়ী পাখি নয়, দেশীয় বন্যপাখিও শিকার হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র রক্ষা এবং শিকার ও বেচাকেনা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জীববৈচিত্র্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সম্প্রতি ফেসবুকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিযায়ী পাখি শিকারের তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরিয়ান হাসান বিদ্যুত নামের এক ব্যাক্তি তার ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্টে জানান, ময়মনসিংহের বিদ্যাগঞ্জ বাজারে ডাহুক ও বালিহাঁস বিক্রি করা হচ্ছে। পোস্টের সঙ্গে যুক্ত ছবিতে খাঁচায় বন্দী একাধিক পাখি দেখা যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পরিবেশ সাংবাদিক হোসেন সোহেলের তার ফেসবুক পোস্টে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাখি শিকার ও বন্যপ্রাণী কেনাবেচার আরও কয়েকটি ঘটনার তথ্য উল্লেখ করেছেন। হোসেন সোহেল আশঙ্কা জানিয়ে তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, আসন্ন শীত মৌসুমে দেশীয় পাখির পাশাপাশি পরিযায়ী পাখিরাও শিকারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। নাটোরের চলনবিল এলাকায় পাখি শিকারে বাধা দিতে গিয়ে এক জেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, জামালপুরে কালিম পাখি শিকার করে ভোরের বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে আসার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা থেকে প্রশ্ন ওঠে, প্রকাশ্যে পাখি শিকার ও কেনাবেচা চললে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা কী?
নাটোরের সামাজিক বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জাহেদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, শুধু রাজশাহী বিভাগীয় বন্যপ্রাণী অফিস রয়েছে। তারাই নাটোরসহ বিভাগের সব জেলা গুলোতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষেণে দায়িত্ব পালন করেন। তবে জেলা সামাজিক বন বিভাগও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করেন। আমাদের সামনে বা বন্যপ্রাণী নিধনের খবর পেলে আমাদের লোকজন অভিযান পরিচালনা করেন। অনেক সময় বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তবে নাটোরে বিভিন্ন সংগঠন গুলো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করছে।
একই ভাবে নোয়াখালীর কবিরহাট, সোনাইমুড়ী, সুবর্ণচর, কোম্পানীগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার জলাশয়, কৃষিজমি, বিল ও চরাঞ্চলে পরিযায়ী পাখির পাশাপাশি দেশীয় পাখিও নির্বিচারে শিকার হচ্ছে। এসব উপজেলার বেশ কিছু এলাকাকে বন্যপ্রাণী ও পাখির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল এবং অভয়াশ্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ সেসব এলাকাতেও পাখি শিকারের ঘটনা ঘটছে।
এনিমেল রাইটস বিডি-৬৪ নোয়াখালীতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পাখি উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী চলতি মৌসুমে ২১ প্রজাতির মোট ১ হাজার ৫১২টি পাখি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৩৩টি জীবিত পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হয়েছে এবং ৭৯টি পাখি মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
সংগঠনটি জানায় শিকারিরা নাইলনের সুতা, বিভিন্ন ধরনের জাল, আঠালো ফাঁদ, এয়ারগানসহ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করছে। জীবিত পাখি ধরে অবৈধভাবে বিক্রির ঘটনাও রয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি রাইমুন চৌধুরী রনি আগামীর সময়কে বলেন, উদ্ধার হওয়া পাখির সংখ্যা প্রকৃত শিকারের চিত্র এক নয়। আমাদের নজরের বাইরে আরও অসংখ্য পাখি শিকার হচ্ছে। একাধিকবার উদ্ধার অভিযানে গিয়ে আমাদের সদস্যরা বাধা, ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়েছেন। আমরা প্রশাসনের সহযোগিতায় আইন মেনে কাজ করতে চাই। পাখি শিকার বন্ধে অভয়াশ্রমগুলোতে নিয়মিত নজরদারি, শিকারিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আইন থাকলেও বন্ধ হচ্ছে না শিকার
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে দেশে আইন রয়েছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী শিকার, ধরা, হত্যা ও অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ রয়েছে। আইন অমান্য করে বন্যপাখি শিকার ও বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও পাখি বিশেষজ্ঞ কামরুল হাসান আগামীর সময়কে বলেন, সার্বিকভাবে সারাদেশে জলাভূমির যে অবস্থা, তাতে মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের চাপে জলাভূমির পরিমাণ ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিথি পাখিরা যখন আমাদের দেশে আসে, তখন বিভিন্ন জায়গায় অবৈধভাবে শিকারের শিকার হয়। এই শিকার বন্ধ করা না গেলে এবং জলাভূমির পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে ধীরে ধীরে এসব পাখির সংখ্যা কমতে থাকবে।
তিনি বলেন, পাখি শিকার বন্ধে আমাদের আইন রয়েছে, আইন প্রয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ শুধু বন বিভাগ বা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি জায়গায় গিয়ে আইন প্রয়োগ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।
তিনি বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাখিরা নিজেদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিযান করে। যেসব এলাকায় তারা আসে, সেখানকার জলাভূমি তাদের খাদ্য ও আশ্রয়ের জোগান দেয়। এসব জলাভূমিতে তারা বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী খায়। আবার তাদের মলমূত্র জলাভূমির পানিতে পুষ্টি উপাদান যোগ করে, যা পানির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। সবকিছু মিলিয়ে পাখিরা জলাভূমির পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের একটি অংশ। কোনো কারণে যদি পাখির আগমন কমে যায়, তাহলে জলাভূমির স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জলাভূমিতে পোকামাকড়ের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে জলাভূমিতে মাছের উৎপাদন এবং অন্যান্য জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ অতিথি পাখির উপস্থিতি জলাভূমির সামগ্রিক পরিবেশের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক নার্গিস সুলতানা বলেন, দেশে পরিযায়ী পাখি শিকারের ঘটনা এখনো ঘটছে। তবে গত ১০ থেকে ১২ বছরের তুলনায় শিকারের প্রবণতা কিছুটা কমেছে। ২০১২ সালে ইউনিটটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সারা দেশে সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫২ থেকে ৫৩টি জেলায় সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছেছে। তার মতে, আগে অনেকেই পাখি শিকারকে সাহসিকতা ও নামডাকের বিষয় মনে করতেন। এখন মানুষ বুঝতে পারছেন, বন্য পাখি শিকার করা অপরাধ।
নার্গিস সুলতানা বলেন, জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকটের কারণে সব এলাকায় সরাসরি অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। তবে সারা দেশে প্রায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন। এ ছাড়া ট্রিপল নাইনের সঙ্গে আমাদের হটলাইন যুক্ত থাকায় বিভিন্ন স্থান থেকে পাখি শিকারের তথ্য পাওয়া যায়। যেসব এলাকায় আমাদের পক্ষে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব হয় না, সেখানে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চলতি শীত মৌসুমে পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণে কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের একটি দল গোপালগঞ্জে কাজ করছে। আগামী সপ্তাহে দক্ষিণাঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলবে।
দেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমে আসার বিষয়টি স্বীকার করে নার্গিস সুলতানা বলেন, শুধু অবৈধ শিকার নয়, পরিবেশদূষণ ও পরিবেশের বিপর্যয়ও পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এসব কারণে সামগ্রিকভাবে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমছে।



