মুস্তাফা মনোয়ারকে গার্ড অব অনার, স্মৃতি-শ্রদ্ধায় শেষ যাত্রা

শহীদ মিনারে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় মুস্তাফা মনোয়ারকে। ছবি: আগামীর সময়
‘গার্ড অব অনার’, ফুলেল শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ আর সমবেত কণ্ঠে প্রিয় গান ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা’—এসবের মধ্য দিয়ে দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ বিদায় জানালেন সহকর্মী, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ।
তারা বলেছেন, মুস্তাফা মনোয়ারের প্রস্থান দেশের শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে সর্বস্তরের মানুষের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ এই শিল্পীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হলে সেখানে শোকের আবহ নেমে আসে। কিংবদন্তি এই শিল্পীকে শেষ বিদায় জানাতে উপস্থিত হন নাট্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরাও পুষ্পস্তবক হাতে শ্রদ্ধা জানান।
এর আগে সকাল ৯টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ মিনারে কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ছাত্র ও অনুগামীরা স্মরণ করেন তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও শিল্পসাধনা।
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেছেন, ‘জলরঙে আঁকায় তার (মুস্তাফা মনোয়ার) জুড়ি ছিল না। কিছুদিন চারুকলায় শিক্ষকতা করার পর তিনি টেলিভিশনে যোগ দেন। টেলিভিশনের শুরুর সময়ে হাতে-কলমে যারা এই মাধ্যমটিকে গড়ে তুলেছেন, তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। বিশেষ করে শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে মুস্তাফা মনোয়ারের জুড়ি খুব কমই ছিল। তাঁর প্রযোজিত ‘রক্তকরবী’ ও ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটক দুটি আজও টেলিভিশনের নাট্য ইতিহাসে অনন্য স্বাক্ষর হয়ে আছে।’
পাপেট শিল্পে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান স্মরণ করে তিনি বললেন, ‘মুস্তাফা পাপেটকে নতুন জীবন দিয়েছেন। বাংলাদেশের পাপেট শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। পাপেটের মাধ্যমে শিশুদের জন্য বিনোদনের পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথাও তিনি তুলে ধরেছেন। এমন মানুষের চলে যাওয়া আমাদের মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যাওয়ার মতো। এই বিরাট শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।’
অভিনয়শিল্পী ও নাট্যনির্দেশক মামুনুর রশীদ মন্তব্য করেছেন, ‘পাকিস্তান আমলে যখন টেলিভিশন প্রযুক্তি এ দেশে আসে, তখন আমরা ভাবতেই পারিনি যে এটার প্রেজেন্টেশন কেমন হবে। তিনি একজন উঁচুমাপের ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে সেই সময়ের স্ক্রিনের একটি রূপ নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। শিশুদের অনুষ্ঠান ও পাপেট ছাড়াও ওই ছোট্ট স্টুডিও এবং বাইরের বারান্দা মিলিয়ে তিনি যে অসাধারণ দুটি নাটক নির্মাণ করেছেন, তা আগামী ১০০ বছর আমাদের দর্শককে প্রভাবিত করবে।’ স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানের কথাও স্মরণ করেন তিনি।
টেলিভিশনে তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং চারুকলার ছাত্র অভিনেতা কেরামত মাওলার ভাষ্য, যারা দেশ ও সমাজকে অনেক কিছু দিয়ে যান, তাদের মৃত্যু নেই। আমার ৩৫ বছরের টেলিভিশন জীবনে যা কিছু শিখেছি, সবই তার কাছ থেকে। গানের অনুষ্ঠানে বিরতির সময় চার দেয়ালের ভেতরেই তিনি যেভাবে স্ক্রিনে কখনো সূর্য ওঠা, কখনো ফুল ফোটা বা আলোর খেলা দেখাতেন, তা ছিল বিস্ময়কর।
চিত্রশিল্পী হাশেম খান বলেছেন, ‘চারুকলায় যোগ দেওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যে তিনি ছাত্রদের প্রাণের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। এরপর ১৯৬৪ সালে যখন কলিম শরাফীর নেতৃত্বে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়, তখন আইয়ুব খানের শাসনামলেও মুস্তাফা মনোয়ার, জামিল চৌধুরী ও শহীদ কাদরীরা টেলিভিশনের নথিপত্র, নিয়োগপত্র এবং শিল্পীদের সম্মানীর কাগজ সম্পূর্ণ বাংলায় করেছিলেন। এটি ছিল এক নীরব শৈল্পিক বিপ্লব।’
শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে উপস্থিত ছিলেন তারিক আনাম খান, নিমা রহমান, ত্রপা মজুমদার, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দীন স্টালিন, শিল্পী মনিরুল ইসলাম, চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান, শারমীন মুরশীদ, কাজী তামান্না, গোলাম রাব্বানী, মোর্শেদুল ইসলাম, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, খায়রুল আলম সবুজ, শহীদুজ্জামান সেলিম, খায়রুল আনাম শাকিল ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম প্রমুখ।
ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষে শ্রদ্ধা জানান গকুল ভিকে। এছাড়া বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ছায়ানট, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, গোলাম মোস্তফা একাডেমি, পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, কর্মজীবী নারী, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, প্রাচ্যনাট, বটতলা, কণ্ঠশীলন, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি, দূরন্ত স্টেশন, ডিরেক্টরস গিল্ড বাংলাদেশ, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মফিদুল হক এবং বঙ্গরঙ্গ নাট্যদলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বের শেষভাগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয় মুস্তাফা মনোয়ারের প্রিয় গান ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা’। গান শেষে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। এরপর মরদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। দ্বিতীয় জানাজা শেষে দুপুরে তা পৌঁছায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে।
নিথর দেহে শেষবার চারুকলায় মুস্তাফা মনোয়ার
চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণেও শিল্পী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
এ সময় শিল্পী হাশেম খান, অনুকূল দাস, তামান্না তিথি, কাওছার হাসান টগর, আলপ্তীনগীর তুষার, মুনিরা জামান, রশীদ আমিনসহ চিত্রকলা অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী স্মৃতিচারণ করেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এক বহুমাত্রিক শিল্পস্রষ্টা। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন, সংগীত, নাটক ও পাপেট শিল্পেও তাঁর গভীর অনুরাগ ও বিচরণ ছিল। শিল্পকে তিনি কখনো একক মাধ্যমে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক বিস্তৃত শিল্পদর্শন।’
চারুকলায় এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ নেওয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে।
চ্যানেল আইয়ে শ্রদ্ধা
চারুকলা থেকে তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। এ সময় চ্যানেল আইয়ের কর্মচারি-কর্মকর্তা ছাড়াও জানাজায় অংশ নেন শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যজন, সংস্কৃতিকর্মীরা।
জানাজার আগে চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ বলেছেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার, তিনি আমাদের সবার গুরুজন। তাঁর সাথে আমাদের সখ্যতা দীর্ঘদিনের। বছর চারেক আগে তার নামে আমরা চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে একটি স্টুডিওর নামকরণ করেছি।’
জানাজা শেষে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহ বনানী কবরস্থানের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই শিল্প-সংস্কৃতির এই মহীরুহ চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন।








