সৃজনশীল অর্থনীতি
নীতিগত স্লোগান নাকি অমিত সম্ভাবনার খাত?

সংগৃহীত ছবি
সৃজনশীল অর্থনীতি কি নিছকই একটি আকর্ষণীয় নীতিগত স্লোগান, নাকি এটি সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আজ শনিবার পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)-এর ফেসবুক লাইভে ‘আজকের এজেন্ডা’-এর বিশেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘সৃজনশীল অর্থনীতি: স্লোগান নাকি অব্যবহৃত সম্ভাবনা?’ শীর্ষক এই আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসি-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। ভার্চুয়াল এই গোলটেবিল বৈঠকে দেশের চলচ্চিত্র, ওটিটি, প্রকাশনা ও হস্তশিল্প খাতের উদ্যোক্তা ও প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ৮০০ কোটি টাকার একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা সরাসরি বরাদ্দ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য জিডিপিতে খাতটির অবদান বৃদ্ধি করা, প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। চলচ্চিত্র, সংগীত, প্রকাশনা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও ডিজাইনসহ বিভিন্ন খাতজুড়ে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং প্রতিষ্ঠা করা।
আলোচনায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা তানিম নূর বললেন, ‘কর সুবিধা প্রদান করা হলে বাংলাদেশি সিনেমায় বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। যা এই খাতকে বিদ্যমান ও নতুন উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।’
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির প্রধান নির্বাহী রেদওয়ান রনি বললেন, ‘সরকার যদি চলচ্চিত্র শিল্পকে শক্তিশালী করতে চায়, তাহলে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর ও নীতি—উভয় ক্ষেত্রেই মনোযোগ দিতে হবে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য তৈরি বাংলাদেশি কনটেন্ট বর্তমানে সাধারণ করপোরেট কাঠামোর অধীনে করারোপিত হয়। কারণ এই খাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা এখনো তৈরি হয়নি। যা একটি উদ্বেগজনক বৈষম্য তৈরি করেছে।
নেটফ্লিক্স ও আমাজনের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশি দর্শকদের কাছ থেকে আয় করলেও, দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর মতো একই করবাধ্যবাধকতার আওতায় পড়ে না, ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী বললেন, ‘দেশজুড়ে সৃজনশীল প্রতিভার অভাব না থাকলেও, সেই প্রতিভাকে লালন ও বাণিজ্যিকীকরণ করার মতো ইকোসিস্টেম এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়। সরকারকে কাঠামোগত সংস্কার গ্রহণ করতে হবে। সৃজনশীল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। শুধু শিল্পীদের ওপরই নয়, বরং পেছনে কাজ করা বিশাল কর্মীবাহিনীর দিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।’
নাট্যকার ও নির্দেশক বাকার বকুল বললেন, ‘বাংলাদেশে নাটক এবং বৃহত্তর অর্থে শিল্পকলা কখনোই প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্যবহনকারী পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। বেশিরভাগ শৈল্পিক কাজ পরিচালিত হয় ব্যক্তিগত ভালোবাসার তাগিদে। নাটককে নিছক একটি স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা ক্ষতিকর। যতদিন নাটক মূলত বিনা পারিশ্রমিকের শ্রমের ওপর নির্ভর থাকবে, ততদিন একটি পেশাদার ও আর্থিকভাবে টেকসই খাত গড়ে তোলা কঠিন হয়েই থাকবে।
তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রায়শই শিল্পের সম্ভাবনা লালনের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রকাশনা খাতকে দেশের সবচেয়ে অবহেলিত খাতগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করে দি ইউটিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন বললেন, ‘জাতীয় গ্রন্থনীতি সঠিকভাবে হালনাগাদ করা হয়নি। আমাদের প্রকাশনা শিল্পকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগ আমরা দেখিনি। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে আমরা কিছুটা অগ্রগতির আভাস পেতে শুরু করেছি।’
কপিরাইট আইন বাস্তবে কম প্রয়োগ হওয়ায় ডিজিটাল ও মুদ্রণ পাইরেসি এই খাতের জন্য চলমান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান তিনি।
ক্ল্যাসিক্যাল হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টসের (সিএইচপি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদ বিন আব্দুস সালাম বললেন, ‘টেকসই রপ্তানির জন্য মান সনদায়ন (কোয়ালিটি সার্টিফিকেশন) ও কমপ্লায়েন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্র্যান্ডিং, যা ছাড়া অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ বাস্তবে রূপ নেবে না।’
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বললেন, ‘বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতিকে তার ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নীতি ইকোসিস্টেম প্রয়োজন। শুধু একমাত্রিক অবকাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের এগিয়ে নিতে পারবে না।
আমাদের প্রয়োজন মানসম্পন্ন অবকাঠামো, যা টেকসই ব্যবস্থাপনা মডেল ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে। এই খাতের প্রতি করনীতির পর্যালোচনা, রয়্যালটি বণ্টন, কপিরাইট সুরক্ষা এবং লাইসেন্সিং—এগুলোকে নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
টেকসই ফলাফল নিশ্চিত করতে তিনি এই খাতের আগ্রহী অংশীজনদের স্বতঃপ্রণোদিতভাবে একত্র হয়ে একটি কৌশলগত রূপরেখা তৈরি করার আহ্বান জানান।






