‘আমি গান করে মেয়ের জন্য আকাশ রেখে যাচ্ছি’

ছবি: আগামীর সময়
‘আমি রয়্যালটির আশায় গান করিনি। তবে এখন রয়্যালটি পাচ্ছি। এটা আমার বাবা দেখে যেতে পারেননি। আমি মেয়েকে বলেছি, আমি গান করে তোর জন্য আকাশ রেখে যাচ্ছি। মানুষ হয়তো জমি কিনে রেখে যায়। আমি রেখে যাচ্ছি গান।’
রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আজ শনিবার সন্ধ্যায় আয়োজিত ‘গীতিকবির সঙ্গে আড্ডা’ অনুষ্ঠানে এভাবেই নিজের শিল্পজীবনের কথা বলেন গীতিকবি তরুণ মুন্সী।
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবন, শিল্পচিন্তা ও জীবনদর্শন নিয়ে কথা বলেন বরেণ্য গীতিকবি শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী। তিনি বললেন, ‘গান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি মানবিক জাগরণেরও শক্তি। আমি চাই, আমরা যেন প্রতিদিন মানুষ হয়ে উঠি।’
শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীর ভাষ্য মতে, ‘জীবনের লক্ষ্য হিসেবে তিনি শুধু গানকে দেখেননি। গানকে আত্মজাগরণ ও সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করতে চেয়েছেন। সময়ের দায়বদ্ধতা পূরণ না করলে প্রকৃত শিল্পী হওয়া যায় না।’
গীতিকার হওয়ার স্বপ্ন, বেতার ও টেলিভিশনে গান পাঠানোর দীর্ঘ অপেক্ষা। পরে বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নিজের জীবনের একটি বেদনাদায়ক স্মৃতিও শোনান শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী। তিনি জানালেন, ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ বেতারে তার প্রথম গান রেকর্ড হওয়ার দিনই তার মা মারা যান। ঘটনাটি আজও তার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি।
‘তার গানে নৈতিকতা, স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও মানবিকতার চর্চাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। জনপ্রিয়তার চেয়ে মানুষের কল্যাণকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাও নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন।’
নিজের জনপ্রিয় গান ‘চন্দ্র সূর্য যত বড়, আমার দুঃখ তার সমান’ প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘গানটি শুনে প্রয়াত ভারতীয় সংগীতশিল্পী বাপ্পী লাহিড়ী মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাঙালির পক্ষেই এমন দুঃখের গান লেখা সম্ভব।’
সংগীতশিল্পী মানাম আহমেদ বললেন, ‘শহীদুল্লাহ্ ফরায়জী অত্যন্ত নান্দনিকভাবে লোকগানের উপাদান তার গানে তুলে ধরেন।’
গীতিকবি লিটন অধিকারী রিন্টু বললেন, ‘প্রতিদানের প্রত্যাশা না করে তিনি সারাজীবন গান লিখে গেছেন। বর্তমান সময়ে এমন নিষ্ঠা খুবই বিরল।’
শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীকে নিয়ে আরও স্মৃতিচারণ করেন তার প্রথম অ্যালবামের শিল্পী মোখলেসুর রহমান নীলু এবং সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী। অনুষ্ঠানে তারা খালি গলায় তার লেখা গানও পরিবেশন করেন।
শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীর একমাত্র কবিতার বই ‘ঐশ্বরিক ঐক্য’-এর প্রকাশক জাকির হোসাইন বললেন, ‘আমার বাবা-মা নেই। এখন কোনো কথা বলার প্রয়োজন হলে আমি শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীর কাছেই যাই। তিনি আমার কাছে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একজন মানুষ।’
আড্ডার দ্বিতীয় পর্বে নিজের গীতিকারজীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তরুণ মুন্সী। তিনি সমকালীন বাংলা গান, সৃষ্টির দর্শন এবং রয়্যালটি নিয়েও কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে শহীদুল্লাহ্ ফরায়জীর পর্ব সঞ্চালনা করেন গীতিকার ও সাংবাদিক নীহার আহমেদ। তরুণ মুন্সীর পর্ব সঞ্চালনা করেন সাকী আহমেদ।
এর আগে স্বাগত বক্তব্যে গীতিকবি সংঘের সাধারণ সম্পাদক জয় শাহরিয়ার বললেন, ‘শিল্পের মূল্যায়ন হতে হবে নির্মোহভাবে। শিল্পচর্চায় বয়স বা লিঙ্গ নয়, শিল্পমানই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য।’




