শরৎ উৎসবে সম্প্রীতির জয়গান

শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর শিউলি-কাশফুলের শুভ্রতায় গান, নাচ ও আবৃত্তিতে মুখর হয়ে উঠল রাজধানীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ছায়ানট ও সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর আলাদা আয়োজনে শরতের সৌন্দর্যের পাশাপাশি উঠে এলো সম্প্রীতি, ঐক্য ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার বার্তা। শিশু-কিশোরদের পরিবেশনা থেকে বরেণ্য শিল্পীদের বক্তব্য— দুই উৎসবেই প্রকাশ পেল একসঙ্গে পথচলার প্রত্যয়।
‘যোগ দে রে আজ সমান তানে’ প্রতিপাদ্যে গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল প্রাঙ্গণে শরৎ উৎসবের আয়োজন করে ছায়ানট ও সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল। এতে অংশ নেয় সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, সেন্ট যোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, এক্সেল একাডেমি, নালন্দা উচ্চবিদ্যালয় ও ছায়ানট।
সকাল সাড়ে ৭টায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে’ শীর্ষক সম্মেলক নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা বলেছেন, ‘এই উৎসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শরতের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনাও ধারণ করতে শিখবে।’
নালন্দা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে সম্মেলক নৃত্যগীত ‘আলোর অমল কমলখানি’।
এক্সেল একাডেমির পক্ষে অরুণাভ দে পরিবেশন করে ‘তোমার মোহন রূপে’ এবং ইপ্সিতা সিকদার গেয়ে শোনায় ‘শরৎ, তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’। সেন্ট যোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে সম্মেলক গান ‘কোন খেপা শ্রাবণ ছুটে এল’ এবং বৃন্দ আবৃত্তি ‘কোন শরতে পূর্ণিমা-চাঁদ’। সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সার্থক সাহা পরিবেশন করে ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক’, বাঁধন কুণ্ডু ‘হৃদয়ে ছিলে জেগে’ এবং দিব্যময় দেশ ‘মেঘেরা দল বেঁধে যায়’। ছায়ানটের পরিবেশনায় ছিল সম্মেলক নৃত্যগীত ‘ওগো শেফালিবনের মনের কামনা’।
অন্যদিকে, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সীমান্ত গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণের সাহারা মঞ্চে গতকাল সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে যন্ত্রসংগীতশিল্পী শামীম জহিরের সরোদ বাদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ‘শরৎ উৎসব-১৪৩৩’। সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী আয়োজিত এ উৎসবে ছিল শরৎ কথন, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, একক সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও পাঠ। এতে অংশ নেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দলের শিল্পীরা।
শরৎ কথন পর্বে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলছিলেন, ‘এ ধরনের উৎসবের মধ্য দিয়ে একসঙ্গে হওয়ার যে আনন্দ, সেটি থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি। আমরা যে উৎসব-অনুষ্ঠানই করি না কেন, তার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আমরা সবাই একসঙ্গে মিলব এবং আমাদের সবার, সবার, সবার প্রাণের কথা বলব ওই অনুষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে। সবার যদি সেখানে ঐক্যের তান থাকে, তাহলেই একটা মানুষ সবার হয়ে উঠবে।’
আলোচনায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় ক্রীড়াব্যক্তিত্ব মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউর রহমান দুলু। অধ্যাপক নিগার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ঘোষণাপত্র পাঠ করেন সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।
আয়োজকদের ঘোষণাপত্রে বলা হয়, শারদোৎসব মানুষ ও প্রকৃতি, জীবন ও মহাজীবন এবং সমকাল ও চিরকালের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে। বাংলার মাটি ও প্রকৃতিকে ঘিরে এমন উৎসব মানুষকে বার্তা দেয় নবআনন্দে জেগে ওঠার। একই সঙ্গে জাগিয়ে তোলে প্রকৃতি ধ্বংসের পদক্ষেপ প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানবসমাজ ও জীবনের বৈচিত্র্য রক্ষার দায়িত্ববোধ।
বৈচিত্র্যের রঙ, রূপ ও রস অক্ষুণ্ন রেখে সম্প্রীতির জয়গান গাওয়াও এ উৎসবের অন্যতম প্রত্যয়। শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, কাশফুলের শুভ্রতা ও শিউলি ফুলের নম্রতায় বাংলার প্রতিটি আঙিনা ভরে উঠবে— এমনটাই প্রত্যাশা আয়োজকদের।
উৎসবে একক সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব ঘোষ, অনিমা রায়, ফেরদৌসী কাকলি ও রত্না সরকার। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন মাহমুদুল হাসান, সঞ্জয় কবিরাজ ও নবনীতা জাইদ চৌধুরী অনন্যা। নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন শ্রাবণী গুহ রায় ও তামান্না নিগার। আধুনিক গান শোনান এস এম মেজবাহ এবং লোকসংগীত পরিবেশন করেন শান্তা সরকার। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি ও বেলায়েত হোসেন।
শিশু-কিশোর সংগঠন সীমান্ত খেলাঘর আসর পরিবেশন করে দলীয় সংগীত। গেন্ডারিয়া কিশলয় কচি-কাঁচার মেলা দলীয় আবৃত্তি, সুরবিহার দলীয় সংগীত এবং শিল্পবৃত্ত কোলাজ পরিবেশনায় অংশ নেয়। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যাক্ষ, স্পন্দন, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্র ও অংশী। নৃত্যাক্ষের পরিচালনায় ছিলেন সালমা মুন্নী, স্পন্দনের অনিক বসু, স্বপ্ন বিকাশ কলা কেন্দ্রের মৈত্রী সরকার এবং অংশীর অনিন্দিতা খান। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, নির্ঝরণী একাডেমি ও সুরনন্দন।



