আবু জাফর শামসুদ্দীনকে স্মরণ, প্রকাশ হলো ‘দিনলিপি'

ছবি: আগামীর সময়
মনীষী আবু জাফর শামসুদ্দীনের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও তার ‘দিনলিপি’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবু জাফর শামসুদ্দীন ও আয়েশা আখতার খাতুন মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে সোমবার বিকাল ৫টায় রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গবেষক মফিদুল হক বলেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন একজন পুরোদস্তুর ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কলাম ও গবেষণার কাজে সবসময় তিনি মানুষের সামনে থাকলেও তার নিজস্ব একটি গভীর জগত ছিল। তিনি জীবনের নানা সময়ে নিয়মিত কবিতা লিখতেন। তবে সেসব কবিতা তিনি কখনো প্রকাশের জন্য লেখেননি, লিখেছেন নিজের আত্মার তাড়নায় ও জীবনের সঙ্গে বোঝাপড়ার তাগিদে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আবু জাফর শামসুদ্দীনের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। শামসুদ্দীনকে নিয়ে শোক প্রস্তাব পাঠের পর তার স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে জাঁ নেসার ওসমান নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ত্রিকালদর্শী’ প্রদর্শিত হয়।
‘দিনলিপি (১৯৭৬–১৯৮২)’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, আবু জাফর শামসুদ্দীন ও আয়েশা আখতার খাতুন মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার দারা শামসুদ্দীন এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
পরে ‘মনীষী আবু জাফর শামসুদ্দীনের রাজনৈতিক দর্শন’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন আবুল খায়ের। তিনি বলেন, “তিনি মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, চেয়েছিলেন মানুষের সামাজিক মুক্তি, রাজনৈতিক মুক্তি।”
লেখক কামরুল আহসান বলেন, ‘আমাদের এ প্রজন্মের মাঝে আবু জাফর শামসুদ্দীন নিয়ে তেমন চর্চা নাই। গুণিজনদের স্মরণে রাখার দায় রাষ্ট্র পালন করছে না। তাই আমাদেরকেই দায়িত্ব নিতে হবে।’
আবু জাফর শামসুদ্দীনের চর্চা অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়ে মফিদুল হক বলেন, ‘বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ কিংবা উচ্চতর গবেষণা আবু জাফর শামসুদ্দীনকে বাদ দিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই সাহিত্য ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। তবে তার এই কাজের চর্চা আমরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে আরও ব্যাপ্ত করতে পারি, সেটাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়।’
আবু জাফর শামসুদ্দীনের স্মৃতি রক্ষা এবং তার অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম সর্বসাধারণের সামনে তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সিকান্দার দারা শামসুদ্দীন বলেন, ‘২০০৩ সালে মা মারা যাওয়ার পর ২০০৬ সালে আমরা ভাইবোনরা মিলে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এই ট্রাস্টটি গঠন করি। ট্রাস্টের মাধ্যমে আমরা গ্রামের প্রাথমিক স্কুলে ২১শে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপন, পুরস্কার বিতরণ, মেধাবৃত্তি দেওয়া, ফ্রি হেলথ ক্যাম্প পরিচালনা ও এককালীন আর্থিক সহায়তাসহ নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজ করে আসছি।’
গবেষণা ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও ট্রাস্ট ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি। আবু জাফর শামসুদ্দীনের সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণের উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বাবার যেসব বইয়ের এখন আর মুদ্রণ নেই, সেগুলোসহ সব প্রকাশনা আমরা পিডিএফ সংস্করণে রূপান্তর করেছি, যাতে পাঠকদের জন্য এগুলো সহজলভ্য করা যায়।’
দিনলিপির পরবর্তী খণ্ড প্রকাশের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭৬ থেকে ১৯৮২ সালের দিনলিপি প্রকাশের পর এবার আমাদের লক্ষ্য ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৮ সাল (মৃত্যু পর্যন্ত) সময়ের দিনলিপি প্রকাশ করা। এটি আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও আগামী বছরের মধ্যেই তা প্রকাশের চেষ্টা করব। এ ছাড়া তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন অপ্রকাশিত রচনা ও চিঠিগুলো সংগ্রহ করে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন মূলত আগামী দিনের মানুষ। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তিনি যে দূরদর্শী চিন্তাভাবনা করতেন, তা আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও সত্য।’
আলোচনার ফাঁকে গান পরিবেশন করেন ছায়ানটের শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস লাকী। তিনি নজরুলগীতি ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ পরিবেশন করেন। এছাড়া গান পরিবেশন করেন আবু জাফর শামসুদ্দীনের নাতনি অদ্বিতীয়া শামসুদ্দীন ও অনন্যা শীলা শামসুদ্দীন। তারা পরিবেশন করেন ‘ওগো দখিন হাওয়া, ও পথিক হাওয়া’ এবং ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’।






