মিরপুরে আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা শুরু

ছবি কোলাজ আগামীর সময়
রাজধানীর মিরপুরে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা। আজ শুক্রবার উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগ এবং আদিবাসী সুহৃদদের যৌথ উদ্যোগে মিরপুর-১৩-এর পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে মেলার উদ্বোধন করা হয়।
নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে এবং সংস্কৃতিকর্মী তনয়া দেওয়ানের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। অনুষ্ঠানে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও মানবাধিকার কর্মী শিরিন পারভিন হক এবং অধিকার কর্মী মেইনথিন প্রমীলা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘আদিবাসীদের খাদ্যাভাসকে দেশের অপরাপর মানুষের কাছে তুলে ধরতে এই উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা থেকে অনেক কিছু জানার, শেখার ও বোঝার রয়েছে আমাদের। এই মেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে বাঙালি ছাড়াও ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, সেই চিত্র ফুটে উঠবে। আদিবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভাসগুলো দেশের সম্পদ। একইসঙ্গে এগুলো দেশের বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম, সেগুলো বিভিন্ন কাজের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। পাহাড়ে উৎপাদিত পণ্য কীভাবে আরও দেশের সর্বত্র পৌঁছানো যায়, সেক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার কাজ চলমান রয়েছে।’
শিরিন পারভিন হক বলেন, ‘এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশে যে বহুজাতির এবং বহুসংস্কৃতির মানুষ বসবাস করে, সেটি ফুটে উঠছে। আমাদের দেশে খাদ্য ভেজালের যে ছড়াছড়ি, সে জায়গায় নিরাপদ খাদ্যের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের খাদ্যপণ্যগুলো এখনো নিরাপদ এবং ভেজালমুক্ত রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাকে সংরক্ষণের পাশাপাশি আদিবাসীদের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা বাঞ্ছনীয়।’
তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভূমির বিষয়টি। প্রতিনিয়ত তাদের ভূমি দখল হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। তাদের এই বিষয়সমূহ রাষ্ট্রের যথাযথ ও কার্যকরী দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এতে আদিবাসীদের উৎপাদিত খাদ্যশস্যগুলো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
মেইনথিন প্রমীলা বলেন, ‘আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলাটি আসলে বর্তমান সময়ে অতি প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার থেকে শুরু করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের যে ব্যবস্থা, সেটি মানুষের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই মেলাটি অন্যতম একটি প্রয়াস। নিরাপদ খাদ্যের যে ব্যবস্থা, সেটি আমরা আমাদের আদিবাসীদের খাদ্যাভাসের মধ্যে দেখতে পাই। আদিবাসীদের খাদ্য উৎপাদনের পদ্ধতি সংরক্ষণ ও বিকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, ‘আদিবাসীরা আমাদের দেশের অংশ। তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব।’
আদিবাসীদের পণ্য বিক্রির জন্য ঢাকায় আলাদা বাজার তৈরির দাবি জানান তিনি। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আদিবাসী সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।
দুই দিনব্যাপী এই মেলায় আদিবাসীদের হরেক রকমের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। পাশাপাশি পাহাড়ের জনপ্রিয় বাঁশের কুঁড়ি বা ব্যাম্বু শুট, কলাপাতায় রান্না করা বিভিন্ন পদের হেবাঙসহ নানা জুমিয়া সবজির মুখরোচক খাবার পাওয়া যাচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চলের জনপ্রিয় খাবার পাজনের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে মেলায় আগত দর্শনার্থীদের। পাশাপাশি সমতলের আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন মণিপুরী, গারো ও রাখাইনরা। কালো ও সাদা বিনিচালের বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু পিঠা নিয়ে হাজির হয়েছেন রাখাইন ভোজনরসিকরা। হালনাগাদ সময়ে বাঙালিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিভিন্ন ধরনের মুন্ডি মেলার অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
মেলা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রতি সন্ধ্যায় থাকবে আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় বাংলাদেশ আইডল মং, পাহাড়ের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা এবং গারোদের উদীয়মান গায়ক মার্কুস চিসিম মঞ্চ মাতাবেন। পাশাপাশি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনা থাকবে।



