শতবর্ষে উত্তম কুমার

উত্তম কুমার। ছবি: সংগৃহীত
এটা মোটেও অত্যুক্তি নয় যে, বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতার নাম উত্তম কুমার। তার জন্মশতবর্ষ দিবস চলে গেল। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তার জন্ম। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ১০০ বছর। জীবদ্দশায় তিনি মহানায়কের খ্যাতি পেয়েছিলেন। তার অকাল প্রয়াণের মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির এক অকৃত্রিম, অনন্য ও বহুমাত্রিক প্রতিভাবান উপস্থাপকের মহা আসনটি শূন্য হয়ে যায়। যা গত পঁয়তাল্লিশ বছরেও পূরণ হয়নি। প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গিয়ে আজকের দিনেও মনে হয়, তার অনুপস্থিতি স্থায়ী এবং তা অপূরণীয়ই থেকে যাবে। তিনি ছিলেন অদ্বিতীয় ও অবিসংবাদিত রোমান্টিক হিরো। উত্তম কুমারদের জুড়ি থাকেনা, একজনই হয়। তারা যুগেযুগে নয়, শতাব্দীর জাতক।
১৯৮০ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে পর্দায় নায়কের অবস্থান থেকেই তিনি আকস্মিক অনন্তলোকে পাড়ি জমান। তাকে বাবা-দাদার চরিত্রে অভিনয় করতে হয়নি। তখন অভিশপ্ত করোনাকাল। এক মধ্যরাতে বাসায় বসে ‘ইন্দ্রানী’ ছবিটি দেখছিলাম। আমার প্রয়াত স্ত্রী জেবু বলেছিল, ‘উত্তম কুমার নায়ক অবস্থায় চলে গিয়ে ভালোই করেছেন। বাঙালি নারী পুরুষ নির্বিশেষে যেকেউ তাকে বৃদ্ধ দেখলে কষ্টই পেত।’ কথাটা আমার প্রায়ই মনে পড়ে। অস্কারজয়ী বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারের মৃত্যুর পরে বলেছিলেন, ‘উত্তম কুমার এক কালজয়ী নায়কের নাম। উত্তমের মত কেউ নেই, তার মত কেউ হবে না। সে পুরোটাই শিল্পী।’ সত্যজিৎ রায় তার বিখ্যাত ‘নায়ক’ সিনেমা করার পরে উত্তম কুমার সম্পর্কে যেসব প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন, তিনি নাকি সারাজীবনে কাউকে এর এক-দশমাংশও করেননি।
উত্তম জাদু বলে একটা কথা আজও চালু আছে। এ জাদু যেন অফুরন্ত, অনিঃশেষ। তার জীবন ও সুনিপুণ অভিনয় শৈলী নিয়ে হাজারো মতামত পাওয়া যায়। কোথাও নেতিবাচক মন্তব্য খুব বেশি চোখে পড়েনি। সেটা বাংলা বা হিন্দি যেকোনো ভাষার সিনেমা নিয়ে হোক। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অদৃশ্য তরঙ্গের কল্যাণে হঠাৎ চোখ আটকে যায়, উত্তম কুমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিগ-বি অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে বা দেবানন্দ বা রাজেশ খান্নার হাত ধরে। বিস্মিত হওয়ার মতন বিষয়, উত্তম কুমারকে এসব জায়েন্টদের পাশেও অধিকতর সপ্রতিভ ও স্বতঃস্ফূর্ত মনে হতো। উত্তম এখানেই আলাদা। তেমনি ৫০ দশক থেকে গোটা ৭০ দশকের সব অনুজ নায়িকার বিপরীতেই তিনি শুধু মানানসই নন, অনিবার্য এবং অতুলনীয়। এটাও আরেক বিস্ময়।
এ দেশের অনেক সিনেমার মানুষ, বোদ্ধাজন বলেন, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটি হওয়ায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী মাইলফলক অতিক্রম করে গেছেন তিনি। এটা কী পুরোপুরি সত্য, গ্রহণযোগ্য মন্তব্য? মনে হয়, না। উত্তম-সুচিত্রার সেরাদের মধ্যে সাড়ে চুয়াত্তর থেকে সাগরিকা, শিল্পী, ইন্দ্রাণী, সবার উপরে, পথে হল দেরী, হারানো সুর, শাপমোচন, বিপাশা আরও অনেক। কিন্তু তার দুর্দান্ত ও অনবদ্য অভিনয় রয়েছে ‘দেয়া নেয়া’ বা ‘জীবন মৃত্যু’ বা সন্যাসী রাজা, এন্টনী ফিরিঙ্গীতে। এমনকি শেষের দিকের নায়িকা শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে ‘অমানুষ’ বা অপর্ণা সেনের ‘মেমসাহেব’ দেখে কী বলা যাবে? আসলে তিনি ছিলেন একজন জাত অভিনেতা। সত্যজিৎ রায় সৌমিত্র চেটার্জীকে বলেছিলেন, দ্যাখো পুলু, “আমি ‘নায়ক’ করছি শুধু উত্তমকে মাথায় রেখে।” মহানায়কের জন্য এই একটা মাত্র বাক্যই কী যথেষ্ট নয় ? উল্লেখ্য ‘নায়ক’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৬৬ সালে। আজ থেকে ৬০ বছর আগে। সুচিত্রা সেন নিঃসন্দেহে সেরাদের সেরা। কিন্তু তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে ডুব দেয়ার পরেও পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই উত্তম কুমার টলিউডের রূপালীপর্দা জুড়ে একচ্ছত্র দাপুটে আর শক্তিমানের আরেক নাম হয়ে টিকে ছিলেন।
উত্তম সুচিত্রা জুটি হয়ে ১৯৫৩ সালের ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ থেকে দেখা গেলে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ছবিতে সুর ও সংগীত পরিচালনা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। প্রথম দিকের প্রায় সকল ছবিতেই উত্তম কুমারের কন্ঠ হয়েছেন কিংবদন্তী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মনে হতো একজনেরই স্বর।
বলাবাহুল্য, ১৯৮৯ সালে শেষবারের মতো বাংলাদেশ সফরকালে বিটিভি’র এক সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালকে বলেছিলেন, ‘আমার কন্ঠকে সবচেয়ে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছিল উত্তম কুমার। পার্থক্য বোঝা যেত না। হারানো সুরের রমা রমা ডাকটি কিন্তু আমার কন্ঠে।' পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বড় শিল্পীও উত্তমের জন্য গেয়েছেন। এঁদের মধ্যে মান্না দে, শ্যামল দত্ত এবং একেবারে শেষের দিকে বেশ কিছু জনপ্রিয় গানে কন্ঠ দিয়েছেন বিখ্যাত কিশোর কুমার। এসব কালোত্তীর্ণ গানের লিরিক রচয়িতাদের মধ্যে প্রধানত: ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুকুল দত্ত। এসব গানের সুর স্রষ্টা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখার্জি, সলিল চৌধুরী, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
উত্তম যুগের অসামান্য স্টারডম সৃষ্টিতে আরও একটা বিষয়কে নিয়ে আলোকপাত করা প্রাসঙ্গিক- তা হলো, তাঁর চলচ্চিত্রের সহশিল্পীগণ বা পার্শ্ব চরিত্রাভিনেতাদের অবদান। যাঁরা তাঁদের নিজস্ব প্রতিভার সবটুকু উজার করে দিয়েছিলেন। দু'চারজনের নাম না বলা হলে অপরাধ হয়ে যাবে। যেমন; হিমালয় সম উচ্চতার ছবি বিশ্বাস, পর্বতশৃঙ্গ পাহাড়ি সান্যাল, নীরব প্রতিদ্বন্ধী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অসাধারণ তুলসী চক্রবর্তী, দুর্দান্ত অনুপ কুমার, গম্ভীরমুখের উচ্চারণ কমল মজুমদার, কৌতুকরাজ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রিয় অনুজ তরুণ কুমার, জহর গাঙ্গুলি ও হীরক রাজার রবি ঘোষ প্রমুখ। এঁরা ছাড়া উত্তম কুমারকে কল্পনায় আনাও দুরূহ ব্যাপার ছিল। একটা চলচ্চিত্রের প্রাণ ও দর্শক প্রিয়তার পেছনের প্রকৃত রহস্যের নাম চমৎকার টিম ওয়ার্ক। যা তাঁর স্বর্ণযুগে উত্তম কুমার পেয়েছিলেন। এটা আজ অনস্বীকার্য ও বাস্তবতা। মহান সত্যজিৎ রায় আরও একটা কথা বলেছিলেন, '৩০ বছরে উত্তম কুমারকে যথাযথ ভাবে মুল্যায়ন করা হয়নি। বলেছিলেন, তাঁর নিজের অনেক ভুল ছিল, কিন্তু উত্তম কুমারের কোনো ভুল ছিল না'।
মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করছে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত সরকার। জানা যায়, তারা উত্তম কুমার অভিনীত চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করছে। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ দিয়েই উৎসবের উদ্বোধন করা হবে। বাংলাদেশের মাত্র দু’চারটি পত্রিকা তাঁর জন্মজয়ন্তী নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করেছে । এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়, বিগত প্রায় ৭০ বছর ধরে মহানায়কের অনুপম অভিনয় মাধুর্য, রোমান্স, পৌরুষদীপ্ত কথোপকথন, মায়াবী হাসি আর অনিন্দ্যকান্তি সৌন্দর্য পৃথিবীর বাংলা ভাষাভাষী বাঙালিকে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। চিরকালের ‘ম্যাটিনি আইডল’ খ্যাত উত্তম কুমারের জন্মশতবছরে বাংলাদেশের একজন বাঙালি হিসেবে তাঁকে গর্বভরে স্মরণ করছি।
লেখক : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক







