বাঙালি মুসলমানের অন্তর্দ্বন্দ্ব চলচ্চিত্রে তুলে ধরেছেন তারেক মাসুদ : সলিমুল্লাহ খান

বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বর্ষব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে করা হয়েছে বর্ষব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন। এ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদকে বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্বের ‘অতর’ চলচ্চিত্রকার হিসেবে অভিহিত করেছেন লেখক ও চিন্তাবিদ সলিমুল্লাহ খান।
সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় রাজধানীর শাহবাগের আজিজ মার্কেটের তৃতীয় তলায় বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম মিলনায়তনে উদ্বোধন করা হয় এ কর্মসূচির। একই অনুষ্ঠানে তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র নিয়ে চার দিনব্যাপী বিশেষ প্রদর্শনীরও শুরু হয়।
এ সময় সলিমুল্লাহ খান জানান, তারেক মাসুদকে শুধু একজন চলচ্চিত্র পরিচালক বললে তার কাজের বিশেষত্ব পুরোপুরি ধরা পড়ে না। তিনি ছিলেন একজন ‘অতর’ চলচ্চিত্রকার। অর্থাৎ, যার চলচ্চিত্রে কাহিনি বা বিষয়বস্তুর পাশাপাশি নির্মাতার নিজস্ব চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জগতকে দেখার একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি ক্রমাগত ফিরে আসে। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণের যে স্বাধীন পথ তিনি তৈরি করেছিলেন, সেই অর্থেই তাকে ‘অতর’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
তিনি বলেন, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি বারবার ফিরে আসে, সেটি হলো বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব। এই সমাজকে তিনি কোনো একরৈখিক পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করেননি। তার কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজ একই সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক, গ্রামীণ ও আধুনিক, স্থানীয় ও বিশ্বজনীন। এর মধ্যে যেমন আছে বাঙালিত্বের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি, তেমনি আছে মুসলমান পরিচয়ের ইতিহাস। আছে ধর্মবিশ্বাস, আবার ধর্মের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও; আছে আধুনিকতার আকাঙ্ক্ষা, আবার আধুনিকতার প্রতি সংশয়ও। এই পরস্পরবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যকার টানাপোড়েনই তার চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান অনুসন্ধান।
সলিমুল্লাহ খানের ভাষ্য, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রকে এই জায়গা থেকে পড়লে দেখা যায়, তিনি বাঙালি মুসলমানকে কেবল ধর্মনিরপেক্ষ বনাম ধর্মীয়, এই দুই মেরুতে ভাগ করে দেখেননি। বরং এই দুই প্রবণতা কীভাবে একই ব্যক্তি, একই পরিবার, এমনকি একই সামাজিক পরিসরের মধ্যেও পাশাপাশি অবস্থান করে, সেটিই ছিল তার আগ্রহের বিষয়।
‘মাটির ময়না’ এই অনুসন্ধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন সলিমুল্লাহ খান। তার ভাষ্য, এখানে মাদ্রাসা, পরিবার, লোকায়ত সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুশাসন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তন, সবকিছু একই সামাজিক ভূগোলের মধ্যে এসে পড়ে। ধর্ম এখানে বাইরে থেকে আরোপিত কোনো বিষয়মাত্র নয়; সেটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ভয়, আশা, নৈতিকতা ও পরিচয়ের অংশ। আবার সেই ধর্ম যখন বিশেষ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা লাভ করে, তখন ব্যক্তির সঙ্গে পরিবার এবং পরিবারের সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের সংঘাত তৈরি হয়। তারেক মাসুদ এই সংঘাতকে সহজ কোনো ভালো-মন্দের সমীকরণে নামিয়ে আনেন না।
সলিমুল্লাহ খান আরও বলেন, তার চলচ্চিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো লোকায়ত বাঙালি মুসলমান সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ক। বাঙালি মুসলমানের পরিচয় কেবল ধর্মতাত্ত্বিক বিধানের মাধ্যমে তৈরি হয়নি; গান, মেলা, লোকবিশ্বাস, আঞ্চলিক সংস্কৃতি, ভাষা এবং নানা ধরনের সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তা গড়ে উঠেছে। তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রে তাই ইসলামকে বোঝার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতিকে বোঝার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
এই অনুসন্ধান ‘রানওয়ে’তে এসে অন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে প্রবেশ করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তারেক মাসুদের আগ্রহ শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ধর্মীয় রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। স্থানীয় মুসলমান পরিচয়ের সঙ্গে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক প্রবাহের সম্পর্কও তার চিন্তার অংশ হয়ে উঠেছিল।
‘মাটির ময়না’ ও ‘রানওয়ে’কে পাশাপাশি রাখলে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক রেখা চোখে পড়ে। একদিকে পাকিস্তান, মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের সময়কার মুসলমান সমাজ; অন্যদিকে বিশ্বায়ন, অভিবাসন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন ধরনের ধর্মীয় রাজনীতির যুগের বাংলাদেশ। সময় বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নটি থেকে গেছে, বাঙালি মুসলমান কে? তার বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের সম্পর্ক কী? এবং রাজনৈতিক সংকটের সময় এই পরিচয়ের ভেতরের দ্বন্দ্বগুলো কীভাবে নতুন রূপ নেয়?
সলিমুল্লাহ খান বলেন, এই জায়গায় তারেক মাসুদের গুরুত্ব সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। তিনি এই প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেন না; বরং সমস্যাটিকেই দৃশ্যমান করেন। কোনো প্রস্তাবিত সমাধান গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে, কিন্তু ‘সমস্যাটি বাস্তব’। সমাধানের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও সমস্যাটির বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না। তারেক মাসুদের রাজনৈতিক বা নান্দনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু তিনি যে সামাজিক দ্বন্দ্বটির দিকে আমাদের তাকাতে বাধ্য করেন, সেটি বাস্তব।
তার মতে, তারেক মাসুদের সাধনাকে কেবল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণের ইতিহাস হিসেবে দেখলে কম দেখা হয়। তার বৃহত্তর কাজ ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের আত্মপরিচয়ের সংকটকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চিন্তার বিষয়ে পরিণত করা। ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্ব, লোকায়ত সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, জাতীয় ইতিহাস ও বৈশ্বিক রাজনীতি, এই দ্বন্দ্বগুলোর কোনো একটিকে মুছে দিয়ে নয়, বরং তাদের সহাবস্থান ও সংঘর্ষকে সামনে এনে তিনি তার নিজস্ব চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণ করেছেন।
তিনি বলেন, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রগুলো আলাদা আলাদা গল্প হয়েও শেষ পর্যন্ত যেন একই বৃহত্তর প্রশ্নের বিভিন্ন অধ্যায়, বাঙালি মুসলমান সমাজ নিজের ভেতরের বিরোধ নিয়ে কীভাবে বাঁচে এবং সেই বিরোধের মধ্য দিয়েই কীভাবে নিজের পরিচয় নির্মাণ করে?
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন, বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি ডা. জহিরুল ইসলাম কচি এবং তারেক মাসুদের ছোট ভাই নাহিদ মাসুদ।
চার দিনব্যাপী বিশেষ প্রদর্শনীর প্রথম দিন সোমবার প্রদর্শিত হয় ‘নরসুন্দর’ ও ‘ইউনিসন’। ২৬ আগস্ট ‘মাটির ময়না’, ২৭ আগস্ট ‘অন্তর্যাত্রা’ এবং ২৮ আগস্ট ‘রানওয়ে’ প্রদর্শিত হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হবে প্রদর্শনী।







