স্মরণে কবি শামসুর রাহমান
রূপালি স্নান থেকে রক্ত আর মিছিলের স্রোতে
- বাংলাদেশের কবিতা ভুবনে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় কাব্যচর্চার মাধ্যমে শামসুর রাহমান এক সময় হয়ে ওঠেন কিংবদন্তিতুল্য কবিপুরুষ।

কবি শামসুর রাহমান। ছবি: সংগৃহীত
সময়ের দিঘল পথ পেরিয়ে এসেছেন কবি। শব্দশস্যের বিশাল ভাণ্ডারে সেই সময়েরই বিচিত্র রূপ, রং, রেখা ও বর্ণের বিস্তার। বাঙালি জীবনের প্রত্যাশা, স্বপ্ন, সংগ্রাম এবং স্বপ্নভঙ্গ, ব্যর্থতা ও যন্ত্রণায় সেই শিল্পিত শস্যক্ষেত্রেও কখনো কখনো লেগেছে রক্তের দাগ। আমরা জানি, শিল্পী সময়ের সন্তান। সময়ের মধ্য দিয়েই তার চলমানতা এবং নির্মাণ ও সৃষ্টির গতি ছন্দ। বাংলাদেশের কবিতা ভুবনে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় কাব্যচর্চার মাধ্যমে শামসুর রাহমান এক সময় হয়ে ওঠেন কিংবদন্তিতুল্য কবিপুরুষ। সৃষ্টির ব্যাপকতা ও গভীরতায় তাঁর সমকালে তিনি অতুলনীয়। এর কারণ, বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ভূমিতল সৃষ্টিতে বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে যেসব কবি অগ্রগণ্য, তাঁদের মধ্যে শামসুর রাহমান অন্যতম। ১৯৪৭-এর দেশভাগের সমসময়িক বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মজিজ্ঞাসা ও সত্তা জিজ্ঞাসার জটিল সন্ধিক্ষণে তাঁর কবিতা রচনার সূত্রপাত। এ সময়ে এ দেশের রাষ্ট্রিক ও ভৌগোলিক পটভূমিতে সূচিত নতুন মেরূকরণ সমাজ সত্তায় গভীর রক্তক্ষরণ ও আত্মদ্বন্দ্ব অনিবার্য করে তোলে। উদ্ভিন্ন মান মধ্যবিত্তের শিল্পবোধ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে মাত্রা নিরূপণের প্রশ্নে। এ-সময়ের কবিমানস দ্বন্দ্বময় ও প্রশ্ন কাতর হয়ে পড়ে সমাজ সত্তা ও নান্দনিকতার দ্বৈরথে।
কবি শামসুর রাহমানের কাব্যযাত্রার সূচনালগ্নে যে জিজ্ঞাসা, অন্তর্দাহ ও অনিঃশেষ যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করি; তার মূলে রয়েছে সমকালীন শিক্ষিত মধ্যবিত্তেরু আত্মজিজ্ঞাসা ও সত্তাসন্ধানের সংকটাবর্ত। কালের এই যন্ত্রণা, ক্রোধ এবং দ্রোহ থেকে মুক্তিলাভের ঐকান্তিকতায় কবি হয়ে পড়েন নিভৃতচারী, অন্তর্মুখী। নিঃসঙ্গ, স্বপ্নময়, অতি-অনুভূতিপ্রবণ এবং নস্টালজিয়া-আক্রান্ত এক রোমান্টিক মন শামসুর রাহমানের প্রথম পর্যায়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য। ঐ সময়ের এক শ্রেণির মধ্যবিত্তের দর্শনহীন, মীমাংসাহীন, উৎকেন্দ্রিক মনোজগৎ তাঁর কবিতার উপজীব্য হয়ে ওঠে। যে কারণে, প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০) কবিতাগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় এই মানসিকতারই প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। যেমন :
‘শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ
অথবা প্রখর ধু-ধু পিপাসার আঁজলা-ভরানো পানীয়ের খোঁজ
শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ
চাইনি তো আমি।’
(‘রূপালি স্নান’)
ত্রিশ-চল্লিশের দশকের বুদ্ধিবাদী ও সমাজমনস্ক শিল্পদৃষ্টির পরিবর্তে সমাজ ও সমষ্টি বিচ্ছিন্ন এক অন্তর্ময় কবিতাভুবনই তাঁর আরাধ্য হয়ে উঠেছে। তবে, জীবনানন্দ দাশের শব্দ, উপমা ও চিত্রকল্পের সুস্পষ্ট প্রভাব সত্ত্বেও সময় ও সমাজ স্বভাবের প্রয়োজনেই তাঁকে সন্ধান করতে হয়েছে নতুন কাব্যবস্তু। দুটি দৃষ্টান্ত থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে :
১. শুয়ে আছে একজন নিরিবিলি ভোরের শয্যায়
শীত-গোধূলির শীর্ণ শব্দহীন নদীর মতন
শিথিল শরীর তার লেগে আছে ফ্যাকাশে চাদরে,
(‘তার শয্যার পাশে’)
২. অজ্ঞাত, বিরূপ এই রুক্ষ দেশে মৌন বাসনাকে
নক্ষত্রের মতো জ্বেলে চাই তাঁকে দুর্নিবার
আতঙ্কের মুখোমুখি, যেমন সে মৃগতৃষ্ণিকার
নিঃসঙ্গ পথিক চায় পান্থপাদপের মমতাকে।
(‘পিতা’)
প্রথম দৃষ্টান্তের জীবনানন্দীয় অনুভব দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে বহুলাংশে অন্তর্হিত হয়েছে। জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টি ও কণ্ঠস্বরকে নিজের মতো করে তোলার শিল্প শক্তি প্রথম পর্যায়েই অর্জন করেন শামসুর রাহমান। যেমন, ‘অপাঙ্ক্তেয়’ কবিতার শেষ চরণ গুচ্ছ :
আমাকে গ্রহণ করো তোমাদের নিকানো উঠোনে
নারীর আর শিশুর ছায়ায় আঁকা, রক্তকরবীতে।
আমার জীবনে নেই তৃপ্তির গৌরব, আর আমি
অর্থ খুঁজি চক্রে চক্রে, সমর্পিত মহাশূন্যতায়।
কী অর্থ নিহিত তবে নিপতিত গাছের পাতায়?
(‘অপাঙ্ক্তেয়’)
এই সরল স্বীকারোক্তির মধ্যেই ‘রূপালি’ স্নান কাতর শামসুর রাহমানের পরবর্তী উত্তরণের সূত্রসমূহ চিহ্নিত হয়েছে।
কাব্যবস্তু হিসেবে বাঙালি মধ্যবিত্তের বহুস্তরবিশিষ্ট অন্তর-বাহিরকে গ্রহণ করার ফলে প্রথম পর্বের শামসুর রাহমান নির্দিষ্ট কোনো তত্ত্ব কিংবা জীবনার্থে উত্তরণে সমর্থ হননি। তাঁর চৈতন্য ও সৃষ্টিতে এ সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক সংকট কোনো রক্তিম আলোড়ন সূচিত করেনি। কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্র করোটিতে’ (১৯৬৩) লক্ষ্য করি মধ্যবিত্তের দর্শনহীন, মীমাংসাহীন আত্মগত ভূগোল থেকে বেরিয়ে আসার আকৃতি। ‘আত্মপ্রতিকৃতি’ কবিতায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে কবির সন্ধান ব্যাকুল মানসিকতা :
আমি তো বিদেশী নই, নই ছদ্মবেশী বাসভূমে-
তবে কেন পরিচয় অন্ধকার ঘরে রাজা, কেন
দেশের দশের কাছে সারাটা জীবন ডুগডুগি
বাজিয়ে শোনাব কথা, নাচাব বানর ফুটপাতে?
(‘আত্মপ্রতিকৃতি’)
শূন্যতা ও নিঃসঙ্গতার ক্রম-আবর্তন থেকে বেরিয়ে আসতে কবিকে অপেক্ষা করতে হয় ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ (১৯৬৮) পর্যন্ত। উল্লেখ্য যে, নান্দনিকতার বিচারে কবিজীবনের গোড়া থেকেই শামসুর রাহমান স্বাবলম্বী। এই স্বাবলম্বন ‘রৌদ্র করোটিতে’ এবং ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’য় (১৯৬৭) পরিপূর্ণতা পেয়েছে।
বিভাগোত্তর পাঁচ দশকেরও অধিককাল বাংলাদেশের কবিতা যে সম্পন্নতা অর্জন করেছে, তার মূলে কাজ করেছে শামসুর রাহমানের প্রকরণ সতর্কতা, ধ্বনিচেতনা, শব্দচেতনা, চিত্র ও চিত্রকল্পময়তা।
একটি সমাজের ব্যক্তির বিকাশ ও আত্মপ্রকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যেই সেই সমাজের আধুনিকায়নের চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। ১৯৪৭-এর পর এ ভূখণ্ডের নববিন্যস্ত রাষ্ট্রকাঠামো এবং সমাজ সংস্থায় ব্যক্তির বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে পড়েছিল জটিল ও দ্বন্দ্বময়। পাশ্চাত্যে, বিশেষ করে ইউরোপের উন্নত, সভ্য দেশগুলোতে ব্যক্তির বিকাশের যে সুশৃঙ্খল ক্রমপরম্পরা আমরা লক্ষ্য করি, বাংলাদেশের তা সম্ভব ছিল না ঐতিহাসিক কারণেই। দীর্ঘকালের কলোনিয়াল শাসন শোষণ-ষড়যন্ত্র-ভ্রষ্ট নীতি যে পরজীবী, অপুষ্ট ও পরস্পর-প্রতিদ্বন্দ্বী মধ্যবিত্ত সৃষ্টি করে এ দেশে, সেখানে ব্যক্তিসত্তার বিকাশ কখনো স্বনির্ভর ও স্বাবলম্বী হতে পারেনি। অন্যদিকে, দুই দশকের রক্তাক্ত সংগ্রাম ও আত্মসন্ধানের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মধ্যবিত্ত এ-পর্যায়ে কিছুটা স্বাবলম্বনের পথ খুঁজে পেয়েছিল। বাংলাভাষী ভূখণ্ডের পূর্বাঞ্চলে মধ্যবিত্তের দ্বিধান্বিত যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকে। এ পর্যায়ের আর্থ-উৎপাদন কাঠামোও ছিল বহুলাংশে সামন্তরীতি ও মূল্যবোধ নিয়ন্ত্রিত। দেশভাগের পর নতুন রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত মধ্যবিত্ত তথা সমস্ত জনগোষ্ঠী পুনরায় নিক্ষিপ্ত হয় নয়া ঔপনিবেশিক শাসনশৃঙ্খলে— যার আদর্শিক ভিত্তি সামন্ততন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা শোষণ ও দমনমূলক। এই সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পরিস্থিতিতে যে কোনো ভূখণ্ডের ব্যক্তির বিকাশ ও স্বনির্ভর হওয়ার সাধনা বিপন্ন হতে বাধ্য।
শামসুর রাহমানের কবিজীবনের প্রথম দুই দশকে কেবল মধ্যবিত্ত শ্রেণিবিকাশের দিক থেকে নয়, ব্যক্তির স্বাধীন বিকাশের পথ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে, বিভাগোত্তর বাংলাদেশের প্রথম পর্যায়ের ব্যক্তি— অনুভূতিলোক অবক্ষয়গ্রস্ত, বহির্জগৎবিমুখ, স্মৃতিবিধুর, নৈঃসঙ্গতাড়িত, সমাজ ও সমষ্টিবিচ্ছিন্ন, আত্মরতি তাড়িত। সময়স্বভাবের এই জটিল ক্ষত ও অন্তর্দাহ শামসুর রাহমানের প্রথম তিনটি কাব্যগ্রন্থে অভিব্যক্ত হয়েছে। যেমন :
১. শিশিরের জলে স্নান করে মন তুমি কি জানতে
বিবর্ণ বহু দুপুরের রেখা মুছে ফেলে দিয়ে
চলে যাবে এই পৃথিবীর কোনো রুপালি প্রান্তে?
(‘রূপালি স্নান’)
২. আমাদের বারান্দায় ঘরের চৌকাঠে
কড়িকাঠে চেয়ারে টেবিলে আর খাটে
দুঃখ তার লেখে নাম। ছাদের কার্নিশ, খড়খড়ি
ফ্রেমের বার্নিশ আর মেঝের ধুলোয়
দুঃখ তার আঁকে চকখড়ি
(‘দুঃখ’)
৩. আমি এক কংকালকে সঙ্গে নিয়ে চলি দিনরাত
অসংকোচে, আতংকের মুখোমুখি কখনো হঠাৎ
তাকে করি আলিঙ্গন, প্রাণপণে ডাক নামে ডাকি
দাঁড়িয়ে সত্তার দ্বীপে নি-শিকড়, একা, আর ঢাকি
ভীত মুখ তারই হতে।
(‘যে আমার সহচর’)
কবির বিপন্ন বহির্জীবন ও মায়াবী স্বপ্নলোকে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে কখনো জীবনানন্দের স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের খণ্ডছবি, নিসর্গ লোক, নস্টালজিয়া, কখনো-বা রবার্ট ফ্রস্টের কৌতুকপরায়ণ, নাটকীয় ও স্বীকারোক্তিধর্মী কাব্যবস্তু। আমেরিকার কবি রবার্ট ফ্রস্টের পিছুটান ছিল অন্য এক জগতের প্রতি। আর শামসুর রাহমানের পিছুটান প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ব্যক্তি-আশ্রয়ী কাব্যোপকরণের প্রতি। কিন্তু তিনি তাঁর এই অঙ্গীকারকে স্বসমাজের ব্যক্তিসত্তা ও সময় ধর্মের উপযোগী করে তুলেছিলেন। যে দর্শনহীন, মীমাংসাহীন জীবন এ পর্যায়ের মধ্যবিত্তের নিয়তি, সেই মধ্যবিত্তের ব্যক্তি স্বরূপের বিচিত্রতল আমরা রাহমানের প্রথম পর্বের কবিতায় প্রত্যক্ষ করি।
শামসুর রাহমানের প্রথম পর্যায়ের আত্মসন্ধান ও আত্মদর্শনে সমাজ-অস্তিত্বের প্রতিফলন নির্বস্তুক ও অনুভূতিময়। ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ থেকে ব্যক্তির নিঃসঙ্গ স্বপ্নযাত্রার সঙ্গে সমাজ জীবনের সংযোগ ঘটতে শুরু করেছে। এই সমাজ কেবল স্বভূখণ্ড নির্ভর নয়, চেতনার বিশ্বায়নেও কবি সমাজের বস্তুগত মাত্রা প্রয়োগ করেছেন। মধ্যবিত্তের স্বপ্নও এখানে বৃত্ত ভেঙে ভবিষ্যৎস্পর্শী :
রোজ সকালে জাগে শহরতলী,
বাতাসে কাঁপে কচি পিয়াল পাতা।
চোরা গলিতে হাঁটছে একা লোক,
স্বপ্ন তার আগামীকালে গাঁথা।
নব্য যুবা নিত্য বলে শুনি
বোধি দীপ্ত জীবন-ঘন ভাষা।
অবাক হয়ে ভাবেন পিতামহ
পুরোনো ঘরে এ কার যাওয়া-আসা?
(‘টানাপোড়েন’)
কিংবা,
আমরা যখন ঘড়ির দুটো কাঁটার মতো
মিলি রাতের গভীর যামে,
তখন জানি ইতিহাসের ঘুরছে কাঁটা,
পড়ছে বোমা ভিয়েতনামে!
(‘প্রেমের কবিতা’)
এভাবেই কবির স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের নিভৃত কোণে বেজে উঠছে আগামীর দীপ্ত পদধ্বনি, ভালোবাসার একান্ত মুহূর্ত হচ্ছে আতঙ্কশিহরিত আর গ্রিক পুরাণের টেলেমেকাস হয়ে উঠছে জাতীয় বীরের প্রতিরূপক বা allegory :
তুমি নেই তাই বর্বরের দল করেছে দখল
বাসগৃহ আমাদের।…
আমিও বাঁচতে চাই, চাই পড়ো-পড়ো বাড়িটাকে
আবার করাতে দাঁড়।...
ইথাকায় রাখলে পা দেখতে পাবে রয়েছি দাঁড়িয়ে
দরজা আগলে, পিতা, অধীর তোমারই প্রতীক্ষায়।
এখনো কি ঝঞ্ঝাহত জাহাজের মাস্তুল তোমার
বন্দরে যাবে না দেখা? অস্ত্রাগারে নেবে না আয়ুধ
আবার অভিজ্ঞ হাতে? তুলবে না ধনুকে টঙ্কার?
(‘টেলেমেকাস’)
এর পর থেকেই শামসুর রাহমানের কবিতা হয়ে উঠেছে দুঃখিনী বর্ণমালার প্রতিচ্ছবি, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের শার্ট হয়ে উঠেছে পরম আরাধ্য ‘প্রাণের পতাকা’। ‘নিজ বাসভূমে’ (১৯৭০) কাব্যগ্রন্থ থেকেই কবির ব্যক্তি-ভূগোলে সামাজিক-রাজনৈতিক রক্তধারা ও সমষ্টি-অস্তিত্বের প্রাণপ্রবাহ প্রবলভাবে অনুপ্রবিষ্ট হতে থাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর কালে রাহমান সামাজিক-রাজনৈতিক বক্তব্যনির্ভর অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন— যেগুলো তাঁর কবিখ্যাতিকে করেছে গগনচুম্বী। কিন্তু আমার বিচারে কবির শিল্পযাত্রার পটভূমিতে ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে পরম সন্ধিক্ষণ। এখান থেকেই তাঁর আত্মসন্ধান ও আত্মদর্শনে ব্যক্তি ও সমষ্টি-অস্তিত্বের যুগলমিলন ঘটতে শুরু করে।‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থ থেকেই জীবনানন্দনীয় স্বপ্নলোক, শাহরিক দোলাচল, স্মৃতি, নিসর্গ ও নস্টালজিয়ার জগৎ থেকে নিজের মূল ভূখণ্ডে শামসুর রাহমানের শেকড় সঞ্চালনের সূচনা। ভাষা আন্দোলনের রক্তিম স্মৃতি-অনুভব, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের জাগ্রত চৈতন্য এবং বাঙালির বিস্ফোরণমুখো আত্মবিস্তারের তরঙ্গাভিঘাত কবির আত্মসন্ধানের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে। কবির পক্ষে পূর্বতন অভিজ্ঞতার জগৎ সম্পূর্ণ অতিক্রম করা সম্ভব না-হলেও সমকালীন জীবন ও সংগ্রাম তাঁর কবিতায় অনিবার্যতা নিয়ে রূপায়িত হয়। রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রশ্নে দ্বিধাগ্রস্ত দূরত্ব অতিক্রম করা শামসুর রাহমানের পক্ষে এ পর্যায়েও পুরোপুরি সম্ভব হয় না। জীবন ও মৃত্তিকার শেকড় থেকে যে-রস আহরণ করে সমষ্টি জীবনের মর্মমূল স্পর্শ করা সম্ভব, তা অধরাই থেকে যায় কবির কাছে। তাঁর কাছে বর্ণমালা, একুশে ফেব্রুয়ারি, আসাদের শার্ট কিংবা হরতালের তাৎপর্য মোহনীয় শব্দবিস্তারের মধ্যেই আবর্তিত হয়। তবে আত্মবিস্তারের প্রশ্নে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাথে স্পর্শকায়নের প্রশ্নে কবির কোনো কোনো উচ্চারণ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। যেমন,
আমি দুর পলাশতলীর
হাড্ডিসার ক্লান্ত এক ফতুর কৃষক
আমি মেঘনার মাঝি, ঝড়-বাদলের
আমি চটকলের শ্রমিক,
আমি মৃত রমাকান্ত-কামারের নয়ন পুত্তলি,
আমি মাটিলেপা উঠোনের
উদাস কুমোর, প্রায় ক্ষ্যাপা, গ্রাম উজাড়ের সাক্ষী,
(‘ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৯’)
কবি নিজের মতো করে জীবনের নতুন এক সংজ্ঞার্থ তৈরির চেষ্টা করেন বটে, কিন্তু মূলীভূত দার্শনিকতার অভাবে তা কোনো কেন্দ্রাভিমুখী হতে ব্যর্থ হয়। জীবন তাঁর কাছে হয়ে দাঁড়ায় অনেকগুলো পরস্পর-প্রতিদ্বন্দ্বী ধারণার যোগফল, আবেগময় অনুভূতি ও স্বভাবকোমল শব্দমালা দিয়েই তিনি নির্মাণ করেন জাতীয় জীবনের উত্তাল মুহূর্তের শব্দরূপ :
বুঝি তাই উনিশশো ঊনসত্তরেও
আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।
সালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকা,
সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।
(‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’)
কবির অবলোকন গভীর না হলেও বিস্তার লাভ করে ক্রমাগত। তিনি রাজপথ দেখেন, নিজেকে শনাক্ত করেন জনসাধারণের মধ্যে। অনুভব করেন, সালামের হাত থেকে ঝরে ‘অবিনাশী বর্ণমালা’। আর ‘হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায়’ দুঃখিনী মায়ের অশ্রু জলে কীভাবে বাস্তবের বিশাল চত্বরে ফুল ফোটে, বরকতের উচ্চারণ তা-ই যেন স্মরণ করিয়ে দেয় বারবার। দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা অপসারণে আসাদের শার্ট হয়ে ওঠে ‘প্রাণের পতাকা’। এইসব সংরক্ত অনুভবের ক্রমাগত উপস্থাপন সত্তে¡ও শামসুর রাহমানের আত্ম সন্ধান কিংবা দর্শনে উপনীত হওয়ার প্রশ্নে কোনো মীমাংসিত বোধে উপনীত হতে পারেন না। মধ্যবিত্তের দ্বিধা দীর্ণ, সুবিধাবাদী চরিত্রের সর্বগ্রাসী রূপ কবিকে ‘রূপালি শহরের উদ্ভাসনে’র মধ্যে টেনে নিয়ে বেড়ায় এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। শামসুর রাহমান নাগরিক কবি। কলোনিয়াল, ক্রমভঙ্গুর, জীর্ণ ও প্রাণহীন শহরের নিস্তরঙ্গ পটভূমির মধ্যেই তাঁর সংবেদনশীল মনের বেড়ে-ওঠা। বিকলাঙ্গ সমাজের আত্মশক্তিতে আস্থাহীন অসংবদ্ধ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ক্রমবিকাশের স্তরগুলো শামসুর রাহমানের আত্মরতিপরায়ণ, দ্বন্দ্বময়, স্ববিরোধী, প্রেম ও সংগ্রামের প্রশ্নে দ্বিধা দীর্ণ মানসরূপ থেকে অনুধাবন করা যায়। সময় ও সমাজের বিবর্তন সমকালীন অন্যান্য কবির মতো প্রবলভাবে আলোড়িত করেনি তাঁকে। তবে অন্তর্বিবর্তনের একটা সূক্ষ্ম স্বভাবধর্ম গোড়া থেকেই তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের কবিতার ধরন বা প্যারাডাইম থেকে শামসুর রাহমান স্বতন্ত্র বৃত্ত নির্মাণ করেছিলেন। নিজের চেতনা ও শিল্পরূপের বহু যত্নে সৃষ্ট ধাঁচ থেকে বেরিয়ে আসা একজন জাত কবির জন্য সহজ নয়। জীবনানন্দ দাশ কিংবা বিষ্ণু দে’কেও এজন্যে দীর্ঘকাল অপেক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ও তার অব্যবহিত পরে রাহমানের বেশকিছু কবিতা খ্যাতির শিথর স্পর্শ করে। কবিতা হিসেবে অতটা সফল না হলেও জাতীয় জীবনের রক্তিম অনুভূতিপুঞ্জের এই রূপায়ণ তাঁর চেতনায় বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন সাধন করে। ‘বন্দী শিবির’ থেকে কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় এক স্বপ্নবিলাসী মধ্যবিত্তের আত্মস্বরূপ অভিব্যক্ত হয়েছে, যেখানে বহির্জীবনের রক্তপাত, যুদ্ধ-নিপীড়ন-নির্যাতন বাঁধভাঙা স্রোতের মতো কবির অন্তর্লোকে প্রবেশ করেছে। জিজ্ঞাসা, আত্মবিস্তার, আত্মশুদ্ধি এবং আত্মশুদ্ধির পর একটা আস্থার পটভূমি এ পর্যায়েই শুরু। কবির প্রশ্ন এবং প্রত্যাশার মধ্যে একটা সঙ্গতিসাধক মিলনসেতুও তৈরি হয়ে যায়। যেমন :
১. তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
(‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’)
২. পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,
নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্ধিদিক
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।
(‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’)
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েই প্রকৃতপক্ষে শামসুর রাহমানের চেতনাজগৎ বহির্জগতের আন্দোলন, সংক্ষোভ ও রক্তপাতে আন্দোলিত হতে শুরু করে। কখনো লোকজীবন, কখনো বা গ্রিক পুরাণলোক, আবার কখনো কখনো স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নের ভগ্ন-চূর্ণ জগৎও আরাধ্য হয়ে উঠেছে কবির। ‘দুঃসময়ের মুখোমুখি’ (১৩৮০), ‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ (১৩৮১), ‘প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে’ (১৯৭৮), ‘ইকারুসের আকাশ’ (১৯৮২), ‘মাতাল ঋত্বিক’ (১৯৮২) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে শামসুর রাহমানের বহুস্তরীভূত চেতনার অভিব্যক্তি ঘটেছে। আত্মসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের পথে কবি এ পর্যায়েও যেন দিকচিহ্নহীন অনন্তের যাত্রী। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী কালের সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনের ভাঙা-গড়া, গণতন্ত্রের অপমৃত্যু, স্বৈরতন্ত্র, সেনাতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতার পুনরুত্থান যে কবিকে বিচলিত করেনি, তা নয়, কিন্তু এক ধরনের নির্লিপ্ত নিরাসক্তি ও একাকিত্ববোধের মধ্যেই মূলত আবর্তিত হতে থাকে তাঁর কাব্যবস্তু। কয়েকটি দৃষ্টান্ত থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে :
১. আত্মগোপন করতে কি চাও পাতার লুকোনো
সবুজ দুর্গে? বৃক্ষ মাচায় পাবে আশ্রয়?
সঙ্গ নেবে কি পাতালনিবাসী কাঁকড়া কোনো?
নিসর্গপ্রীতি আর বিপদের বিবাদ চুকোনো
সহজ তো নয়। বস্তুত তুমি খুঁজছো অভয়
তীব্র সত্তা-সঙ্কটে এই বিজনে এখানে।
(‘গণ্ডার গণ্ডার’)
২. এখন নিঃসঙ্গ আমি, পরিপার্শ্ব কর্কশ বিমুখ, উপরন্তু
অত্যন্ত বিরল বন্ধু। বুঝি তাই হৃদয়ের তন্তু
কেমন বেসুরো বাজে।
(‘প্রবাসী’)
৩. মৃতের মুখের কাছে মুখ নিয়ে কিছু গূঢ় কথা
জিগ্যেস করতে সাধ হয়, কিন্তু ভুলে যাই সব।
কেমনে অমন পড়ে থাকে একা এমন অচিন,
শূন্য খাঁচা স্তব্ধতায় কম্পমান, হায়, গানহীন।
মৃতের মুখের কাছে মুখ নিয়ে দুঃখের ভিতরে
বসে থাকি কিছুক্ষণ খুব একা, মেঘ হয়ে যাই।
(‘মৃতের মুখের কাছে’, প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে)
এই নৈঃসঙ্গ্য, একাকিত্ব ও বেদনাবিধুর জগতে ক্রমাগত জমা হতে থাকে রক্তচিহ্ন, অভিজ্ঞতার বিদীর্ণ বেলাভূমিতে ভিড় করতে থাকে হারানো স্বজন, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, ক্রোধ ও প্রতিশোধের পুঞ্জীভূত বারুদ। তাঁর ‘ইকারুসের আকাশ’ তাই আর শূন্যতা বিহারের পুরাণলোক হয়ে থাকে না, নিহত এ্যাগামেমননের শোকে মোহ্যমান কন্যা ইলেক্ট্রার মধ্যে পুনরুজ্জীবন ঘটে কবির :
কান পেতে থাকি দীপ্র কণ্ঠ শোনার আশায়,
কাকের বাসায় ঈগলের গান কখনো যায় কি শোনা?
ক্রাইসোথেমিস, অবুঝ তন্বী, দূরে সরে থাকে,
বিকচোন্মুখ শরীরে এখন লায়ারের ঝংকার।
নিহত জনক, ত্র্যাগামেমনন্, কবরে শায়িত আজ।
আমার উপমা দাবানলে-পোড়া আর্ত হরিণী;
মৃতের মিছিল খুঁজি দিনরাত, আঁধারে লুকাই মুখ।
করতলে কত গোলাপ শুকায়, ঝরে জুঁই, বেলী;
আমার হৃদয়ে প্রতিশোধ জ্বলে রক্তজবার মতো।
(‘ইলেক্ট্রার গান’)
আত্মসন্ধানের এই পথ ধরেই তাঁর আরাধ্য হয়ে ওঠে লুই আরাগঁর সংগ্রাম ও স্বপ্নলোক, সন্তানের শোকে বিদীর্ণচিত্ত ডেডেলাস কিংবা চাঁদ সওদাগরের মৃত্যুঞ্জয় আত্ম-আবিষ্কার :
১. আরাগঁ তোমার মতো আমিও একদা
শক্রুপরিবৃত শহরের হৃদয়ে স্পন্দিত হ’য়ে
লিখেছি কবিতা রুদ্ধশ্বাস ঘরে মৃত্যুর ছায়ায়
আর স্বাধীনতার রক্তাক্ত পথে দিয়েছি বিছিয়ে কত রক্তিম গোলাপ।
(‘আরাগঁ তোমার কাছে’)
২. বলেই হয়তো আমি তাকে আরো বেশি ভালোবেসেছি তখন।
পিতা আমি, তাই সন্তানের আসন্ন বিলয় জেনে
শোকবিদ্ধ, অগ্নিদগ্ধ পাখির মতন দিশাহারা;
শিল্পী আমি, তাই তরুণের সাহসের ভষ্ম আজ
মৃত্যুঞ্জয় নান্দনিক সঞ্চয় আমার।
(‘ডেডেলাস’)
৩. লাঠি আছে হাতে, আছে
ধমনীতে পৌরুষের কিছু তেজ, যতদিন ঠোঁটে
আমার মুহূর্তগুলি ঈষৎ স্পন্দিত হবে, চোখে
নিমেষে উঠবে ভেসে কোনো শোভাযাত্রার মশাল,
করব না আন্ধারের বশ্যতা স্বীকার ততদিন,
যতই দেখাক ভয় একশীর্ষ, বহুশীর্ষ নাগ,
ভিটায় গজাক পরগাছা বারংবার, পুনরায়
ডিঙার বহর ডোবে ডুবুক ডহরে শতবার,
গাঙ্গুড়ের জলে ফের যাক ভেসে লক্ষ লখিন্দর।
(‘চাঁদ সদাগর’)
সময়, সমাজ ও অভিজ্ঞতার বিচিত্র চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এভাবেই শামসুর রাহমান আত্মসন্ধান ও সত্তাসন্ধানের জঙ্গমতায় পৌঁছে যান। একজন মহৎ কবির জগৎ দর্শনহীন মীমাংসাহীন থাকা সম্ভবও নয়। ‘রূপালি স্নানকাতর কবিকে এজন্য অতিক্রম করতে হয়েছে দীর্ঘ পথ, অভিজ্ঞতার অনেক রক্তিম বন্দর, নিঃসঙ্গতার অজস্র বিষণ্ন প্রহর। স্মৃতি, প্রত্নলোক, স্বপ্ন ও পুরাণের মধ্যে সম্ভবত সেই আদিশক্তির বসবাস, যা একসময় শিল্পীকে পৌঁছে দেয় জীবনের হ্যাঁ-বাচক সত্যের উপকূলে। যেখানে অভিজ্ঞতার খণ্ড খণ্ড মানুষগুলো পরিণত হয় অভিজ্ঞানে, ব্যক্তি রূপ নেয় মানবসত্তায় (‘মানুষের কাছে যাও, নাও মানুষের হৃদয় গোলাপ ঘ্রাণ’), পৃথিবীর দেশে দেশে নিপীড়িত মানবত্মার জন্যও চেতনায় সঞ্চিত হতে থাকে ভালোবাসার আগুন :
ধ্বংসস্তূপে ফুল কুড়াবার জন্যে ঝুঁকতেই মনে পড়ে যায়,
বিশীর্ণ ইথিওপিয়া ক্রমশ মরছে অসহায়
দু’চোখ উল্টিয়ে। বর্তমান জীবন মৃত্যুর ভেদ লুপ্ত,
কর্কশ-বাঁশির তালে-তালে গলা ছেড়ে
আমাকে গাইতে হবে গান। সুর যত
ওঠে উচ্চগ্রামে, তত রক্ত ঝরে বুক থেকে; ধ্বংসস্তূপে গান
গাইলে নিশ্চিত বুকচেরা রক্ত ঝরাতেই হয়,
এই রক্তধারা যায় ছায়াপথে, নক্ষত্রের দিকে।
(‘এই রক্তধারা যায়’)
মুক্তিযুদ্ধোত্তর তিন দশকেরও অধিককাল ধরে শামসুর রাহমান অসংখ্য কবিতা রচনা করেছেন — বিষয়, প্রকরণ ও সৃষ্টিবৈচিত্র্যে যা অতুলনীয়। বাঙালির ব্যক্তিক ও সমষ্টিজীবনের বহুমুখী সংকট ও সম্ভাবনার সমান্তরালে সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের রক্তিম, বেদনাঘন ও অনুভূতিময় সময়পরম্পরাকে তিনি কবিতার উপজীব্য করেছেন।
১৯৭৫ পরবর্তী তিন দশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও প্রগতির রথের চাকা
যখন ক্রমাগত রক্তাক্ত ও পশ্চাৎমুখী হতে শুরু করে, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বপ্নচারী কবির
অন্তর্লোকের রক্তক্ষরণ তখন প্রবল থেকে প্রবলতর হতে থাকে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় মৌলবাদ
রাষ্ট্রের শীর্ষদেশ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলে কবি কেবল কবিতায় নয়, রক্তাক্ত রাজপথে
নয় —
উদ্দাম, প্রতিবাদী মিছিলেরও অগ্রভাগে অবস্থান গ্রহণ করেন। সমাজ ও সময়ের রাজনৈতিক প্রত্যাশার
সঙ্গে কবির শিল্প-অভিপ্রায়ের এই মিলন বাংলাদেশের কবিতা-সংষ্কৃতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা
সংযোজন করেছে। রুপালি স্নানকাতর কবি তখন ধাবমান রক্ত আর মিছিলের স্রোতের পুরোভাগে।
তাঁর নির্ভীক কবিকণ্ঠ তখন প্রগতিরোধী রাষ্ট্রযন্ত্র, ধর্মীয় মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা
এবং মানবতাবিরোধী সব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার। জাতির মৌল কণ্ঠস্বর যেন মিলে যায়
শামসুর রাহমানের কবিকণ্ঠের সঙ্গে।
লেখক: ১৯৫৭ সালের ২১ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুরে জন্মগ্রহণ করেন রফিকউল্লাহ খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের উপন্যাস: বিষয় ও শিল্পরূপ (১৯৪৭-১৯৮৭)’। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।













