মৃত্যুদণ্ডের রায় হলেই সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসি নয়, এরপর কী হয়?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আজ রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেহীন এ রায় ঘোষণা করেন। আলোচিত এ মামলার বিচারকাজ শেষ হয় মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে।
দ্রুত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কারণে মামলাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন, আদালত মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়ার পরই কি ফাঁসি কার্যকর করা হয়? উত্তর হলো—‘না’।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর হওয়ার আগে একাধিক বাধ্যতামূলক আইনি ও সাংবিধানিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এসব ধাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না।
ডেথ রেফারেন্স: প্রথম বাধ্যতামূলক ধাপ
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলে সেই রায় সরাসরি কার্যকর হয় না। রায় ঘোষণার পর মামলার সব নথিপত্র হাইকোর্ট বিভাগে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডেথ রেফারেন্স’।
আইন অনুযায়ী, রায় ঘোষণার তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিচারিক আদালতকে নথি হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। হাইকোর্ট তখন মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, বিচারিক আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং রায়ের আইনগত ভিত্তি পর্যালোচনা করে।
আসামির আপিলের সুযোগ
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭১ ও ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাইকোর্টে আপিল করতে পারেন। সাধারণত রায় ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে আপিল দায়েরের বিধান রয়েছে।
তবে আসামি আপিল না করলেও হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্সের মাধ্যমে মামলাটি পরীক্ষা করেন। অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ডের রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চ আদালতের নজরদারির আওতায় আসে।
হাইকোর্ট কী করতে পারেন?
মামলা পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট কয়েক ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
* মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন।
* মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে খালাস দিতে পারেন।
* সাজা কমিয়ে অন্য কোনো দণ্ড দিতে পারেন।
* প্রয়োজনে পুনর্বিচারের নির্দেশ দিতে পারেন।
হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া বিচারিক আদালতের দেওয়া কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না।
এরপর আপিল বিভাগ
হাইকোর্ট মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ পান। সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আপিল বিভাগের অনুমোদন ছাড়া কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যায় না। ফলে হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও মামলার আইনি লড়াই তখনো শেষ হয়ে যায় না।
এ পর্যায়ে আসামি দুটি উপায়ে আপিল করতে পারেন—
* কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেল আপিল।
* ব্যক্তিগত আইনজীবীর মাধ্যমে নিয়মিত আপিল।
অনেক ক্ষেত্রে দুটি আপিল একসঙ্গে শুনানি হয়। তবে আলাদাভাবে শুনানি হলেও তাতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটে না।
রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন
আপিল বিভাগেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি রিভিউ আবেদন করতে পারেন।
এটি মূলত আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন। আদালত যদি মনে করেন, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুনরায় পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে তা বিবেচনায় নিতে পারেন।
রিভিউ খারিজ হলে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রায় সব ধাপ শেষ হয়ে যায়।
রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষা
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির সামনে একটি সাংবিধানিক সুযোগ থাকে।
সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ এবং কারাবিধির ৯৯১ বিধি অনুযায়ী, তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করতে পারেন।
রাষ্ট্রপতি চাইলে—দণ্ড মওকুফ করতে পারেন, সাজা কমিয়ে দিতে পারেন, আবেদন নাকচ করতে পারেন।
ক্ষমাভিক্ষা নাকচ হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ চূড়ান্তভাবে উন্মুক্ত হয়।
কবে জারি হয় ফাঁসির পরোয়ানা?
রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট আদালতে পৌঁছানোর পর আদালত ফাঁসির পরোয়ানা জারি করেন।
এরপর পরোয়ানা পাঠানো হয়—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, সংশ্লিষ্ট কারাগারে, প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর কারা কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ও সময় নির্ধারণ করেন।
শেষ সাক্ষাতের সুযোগ
ফাঁসি কার্যকরের আগে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়।
এ সময় স্বজনরা কারাগারে গিয়ে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করতে পারেন। এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত কারা-প্রথার অংশ।
যেভাবে কার্যকর হয় মৃত্যুদণ্ড
কারাবিধি অনুযায়ী সাধারণত গভীর রাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসি কার্যকরের সময় উপস্থিত থাকেন—নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, কারা কর্তৃপক্ষ, পুলিশ কর্মকর্তা, সিভিল সার্জন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক।
সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর দণ্ডিত ব্যক্তিকে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। জেল সুপারের নির্দেশে জল্লাদ লিভার টানলে ফাঁসি কার্যকর হয়।
কারাবিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। পরে চিকিৎসক মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
এরপর কী হয়?
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর মরদেহের সুরতহাল ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এরপর মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রামিসা হত্যা মামলার ক্ষেত্রে কী হবে?
রামিসা হত্যা মামলায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হলেও এখনই সেই দণ্ড কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই।
আইন অনুযায়ী প্রথমে মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে যাবে। এরপর আপিল, আপিল বিভাগের শুনানি, রিভিউ এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাভিক্ষার আবেদনসহ সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে।
অর্থাৎ আলোচিত এই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হলেও ফাঁসি কার্যকর হওয়ার আগে এখনো দীর্ঘ সাংবিধানিক ও বিচারিক পথ বাকি রয়েছে।




