সিএমএম আদালতে ৭৬ শতাংশ আসামিই খালাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মামলা হয়েছিল, তদন্তও হয়েছিল। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। এরপর অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে শুরু হয় বিচার। রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করে, প্রমাণও উপস্থাপন করে। কিন্তু দীর্ঘ সেই বিচারপ্রক্রিয়ার শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র— ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে রায়ে নিষ্পত্তি হওয়া প্রতি ১০০ আসামির মধ্যে ৭৬ জনই শেষ পর্যন্ত খালাস পাচ্ছেন। সাজা হচ্ছে মাত্র ২৪ জনের।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সাজাপ্রাপ্ত আসামির হার বেড়েছে। এ সময়ে প্রতি ১০০ আসামির মধ্যে প্রায় ৩৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে সাজা হয়েছে।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৪৭ মাসে সিএমএম আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় ৪১ হাজার ৬৭২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় আসামি ছিলেন ৪১ হাজার ৯১৫ জন। বিচার শেষে ৩১ হাজার ৮০৭ জন খালাস পেয়েছেন। বিপরীতে সাজা হয়েছে ১০ হাজার ১০৮ জনের। অর্থাৎ, বিচার শেষে প্রায় ৭৬ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায়নি।
কেন তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও আদালতে গিয়ে এত বিপুলসংখ্যক আসামি খালাস পাচ্ছেন— মামলাগুলোর নথি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তার নানা কারণ। কোথাও সাক্ষী আদালতে এসে ঘটনার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জবানবন্দি দিয়েছেন। কোথাও একাধিক সাক্ষীর মধ্যে মাত্র একজনকে আদালতে হাজির করা গেছে। মামলা থেকে অভিযোগপত্র দেওয়া পর্যন্ত আলামত সংরক্ষণে গাফিলতি, ফরেনসিক প্রতিবেদনে অসংগতি, ডিজিটাল প্রমাণের অভাব, দুর্বল তদন্ত এবং সাক্ষী হাজির করতে না পারাও খালাসের বড় কারণ হয়ে উঠছে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর একটি ডাকাতি মামলার ঘটনাই এর একটি উদাহরণ। ২০২০ সালের ২৭ জুলাই পুলিশের অভিযানে ডাকাত দলের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্ত শেষে একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে তাদের বিচার শুরু হয়।
বিচার চলাকালে মামলার বাদী, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ চারজন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে দুজন জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, মামলার ঘটনার বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি উল্লেখ করে চলতি বছরের ৪ মে পাঁচ আসামিকেই বেকসুর খালাস দেন বিচারক। এমন উদাহরণ আছে আরও অনেক।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সিএমএম আদালতে ৬ হাজার ৫৭৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় আসামি ছিলেন ৬ হাজার ৬৯০ জন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ২৮১ জন খালাস পেয়েছেন এবং ২ হাজার ৪০৯ জন সাজা পেয়েছেন।
এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ মাসে ৫ হাজার ৭১৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এসব মামলায় ১ হাজার ৩০ জনের সাজা হলেও খালাস পান ৪ হাজার ৬৯১ জন। ২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৭০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। এ সময়ে সাজা হয় ২ হাজার ৬২৯ আসামির আর খালাস পান ৮ হাজার ৯৫৬ জন।
২০২৪ সালে ৮ হাজার ৪০৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এসব মামলায় আসামি ছিলেন ৮ হাজার ৪১৮ জন। তাদের মধ্যে সাজা হয়েছে ১ হাজার ৯২০ জনের, আর ৬ হাজার ৪৭৯ জন খালাস পেয়েছেন। ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়। এসব মামলায় ৯ হাজার ৫২০ আসামির মধ্যে ৭ হাজার ৪০০ জন খালাস এবং ২ হাজার ১২০ জন সাজাপ্রাপ্ত হন।
এদিকে ৪৭ মাসের তথ্য তিন সরকারের সময় ধরে বিশ্লেষণ করলে সাজা ও খালাসের হারে পার্থক্যও স্পষ্ট হয়।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৮ মাসে— অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ১৪ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় আসামি ছিলেন ১৪ হাজার ১৩৭ জন। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৯৮৭ জন খালাস পেয়েছেন এবং সাজা হয়েছে ৩ হাজার ১৫০ জনের। অর্থাৎ, এ সময়ে ৭৭ দশমিক ৭১ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি।
অন্যদিকে বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে— অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৫ হাজার ৫৮২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলায় আসামি ছিলেন ৫ হাজার ৬৪৪ জন। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৮৮ জন খালাস পেলেও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন ২ হাজার ৫৬ জন। অর্থাৎ, এ সময়ে ৩৬ শতাংশের বেশি আসামির সাজা হয়েছে, যা আগের দুই সময়ের তুলনায় বেশি।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২৩ মাসে— অর্থাৎ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ২১ হাজার ৯৬টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এসব মামলায় ২২ হাজার ১৫৩ আসামির মধ্যে ১৭ হাজার ২৩২ জন খালাস পান। সাজা হয় ৪ হাজার ৯২১ জনের। এ সময় ৭৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
খালাস পাওয়া মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তদন্তের শুরু থেকেই দুর্বলতা থাকলে শেষ পর্যন্ত আদালতে সেটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। ফরেনসিক প্রতিবেদনে গরমিল থাকে। ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে ঘাটতি থেকে যায়। আবার কোনো কোনো তদন্তকারী কর্মকর্তা পর্যাপ্ত ও কার্যকর তদন্ত ছাড়াই নামমাত্র অভিযোগপত্র জমা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাক্ষীদের জবানবন্দি যথাযথভাবে রেকর্ড না হওয়া এবং পরে সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে না পারাও বড় সমস্যা। কিছু মামলায় বাদী ও আসামির মধ্যে আপস হয়ে যায়। অনেক সাক্ষীকে পরে খুঁজে পাওয়া যায় না। মামলার বিপুল চাপের কারণে রাষ্ট্রপক্ষও প্রতিটি মামলা যথাযথভাবে তদারকি করতে পারে না। এসব দুর্বলতার সুযোগে শেষ পর্যন্ত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান আসামিরা।
সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. শাহজাহান সাজু আগামীর সময়কে বললেন, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মামলা মিথ্যা। আর বাকি ২০ শতাংশ মামলার ক্ষেত্রেও তদন্তে নানা দুর্বলতা থাকে। ফলে প্রকৃত অভিযোগের মামলায়ও আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয় না এবং আসামিরা খালাস পেয়ে যান।
তার ভাষ্য, ‘তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি রাখা যাবে না। প্রয়োজনে তদন্তকারী কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলার প্রবণতা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।’
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বললেন, সিএমএম আদালতে বিচারাধীন যৌতুক ও প্রতারণার অধিকাংশ মামলাই পরে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পথে যায়। আবার মাদক ও ডাকাতির অনেক মামলায় ভাসমান মানুষকে সাক্ষী করা হয়। পরে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না বা আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বললেন, ‘সাক্ষী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও সচেতন হতে হবে। সম্ভব হলে স্থানীয় ও সহজে শনাক্তযোগ্য মানুষকে সাক্ষী করা উচিত। তাহলে বিচারকাজের সময় সাক্ষী হাজির করা সহজ হবে এবং অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে।’








